পশ্চিম পাকিস্তানি উপনিবেশিকতাঃ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট

পোস্ট কোলোনিয়াল যুগে উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে আবার যে অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক শোষণের শিকার হয়েছে নব্য স্বাধীন দেশসমূহ, সে ছায়া উপনিবেশিক অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ভারতের নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক Dr. K.P Misra , Intra state Imperialism টার্মটি ব্যবহার করেছিলেন। উপনিবেশ আর সাম্রাজ্যবাদ মূলত যাহাই বায়ান্ন তাহাই তেপ্পান্ন। শোষণের স্বরূপ এ ভিন্নতা নেই। দুইটার Conceptual definition কিছুটা পার্থক্য থাকলেও Functional definition এ তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।

আবার দুটো ধারণার একটা সংশ্লেষিত রূপ Neo Colonialism। কিন্তু পাকিস্তানি শোষণের রূপটি উপনিবেশিক শোষণের সাথেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য একটি স্বর্ণযুগ। শাসিতের কাতার থেকে একলাফে শাসকের কাতারে উঠে যাওয়া। আর এটা ছিল পূর্ব বাংলার জন্য আরেকটি ব্রিটিশ শাসনের সূচনা এবং অমানিশা কাল। পশ্চিমা শাসক চক্র শোষণের সবগুলো সমীকরণই সফলতার সাথে স্পর্শ করেছিল। রাজনীতি- অর্থনীতি- সমাজ-সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাবিয়ে রাখা হয়েছিল পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে। তাদের অর্থনৈতিক শোষণের পরিসংখ্যান উপনিবেশিক শক্তির থেকেও খানিকটা সমৃদ্ধ। ধর্মের ধোঁয়া দিয়ে নির্মিত রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলার মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি হয়তো পাওয়া যাবে না।

এ পোস্টে কিছুটা অগোছালোভাবে পূর্ব বাংলার উপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণের একটি খণ্ড চিত্র দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পূর্ব বাংলার অর্থ কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের নগর বন্দর নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে তার কিছুটা বর্ণনা করা হয়েছে।

১৯৪৮-৫০ সালে পূর্ববাংলা Rs ৬২২ মিলিয়ন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে যাত্রা শুরু করে যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান Rs ৯১২ মিলিয়ন নিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৭-৫৮ সালে গিয়ে পূর্ব বাংলার বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য’র ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত ছিল Rs ৩,৬৩৬ মিলিয়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল Rs ৩০৪৭ মিলিয়ন। স্বভাবতই দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার আয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক বেশী। এই ধারাবাহিকতা প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
পাকিস্তানের প্রথম দিকে পূর্ব বাংলার GDP growth rate ছিল ২.২% এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৩.১%। ১৯৫৪-৫৫ থেকে ১৯৫৯-৬০ এ জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি হার ছিল ১.৬% পূর্ব বাংলায় আর পশ্চিম পাকিস্তানে ৩.২%। উৎপাদন ব্যবস্থার বৈষম্যের জন্য পূর্ব বাংলার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমতে থাকে। এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু আয় এর সূচক প্রথম সময়ের -০.১% থেকে কমতে কমতে –০.৭% এ গিয়ে ঠেকে। তার বিপরীতে +০.৮% থেকে বেড়ে পৌঁছে +১.৮%।

উপরের সারণি দ্বারা এটা স্পষ্ট যে মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষ পূর্ব বাংলায় বসবাস করলেও পূর্ব বাংলার মানুষ ব্যয়ের হিস্যায় পেত মাত্র ২৫-৩০%। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল পূর্ব বাংলার ৬০% প্রায়। পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশই ছিল পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ধরা পড়ে। ১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২% বেশি ছিল আর দশ বছরের মাথায় এ ব্যবধান গিয়ে ঠেকে ১৯৬৯-৭০ সালে ৬১%। বাংলায় অবস্থিত ৪৩% শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিগণ আর পশ্চিম পাকিস্তানের শত ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

পাকিস্তানি সংবাদপত্র Daily Times, ২৩ ডিসেম্বর ২০১১ এ প্রকাশিত Naseer Memon এর একটি কলামে এর একটি স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। অবশ্য এসব সংখ্যা তাত্ত্বিক হিসেবে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ থাকে না। তার কলামে উল্লেখ করা হয়,

‘East Pakistan having almost 54 percent population was also discriminated against in public sector development. During the first five year plan, the total revenue expenditure in East Pakistan was Rs 2,540 million, which was less than one-third of the Rs 8,980 of West Pakistan. It was marginally ameliorated in the second five year plan from 1960-61 to 1964-65 when East Pakistan received Rs 6,254 million under the public sector development programme against Rs 7,696 million for West Pakistan, yet it was still 19 percent less.

Cumulative figures of development expenditure of the two decades from 1950-51 to 1969-70 further explain the economic prejudice. Total development expenditure in East Pakistan remained disproportionately Rs 29,960 million against Rs 61,980 million in West Pakistan. Per capita GDP growth is another relevant indicator, which also depicts the same trend during the last ten years from 1959-60 to 1969-70. Per capita GDP growth in East Pakistan remained 17 percent against 42 percent in West Pakistan.’

পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫৯% এর জোগানদার ছিল পূর্ব পাকিস্তান কিন্তু মাত্র ৩০% আমদানি ভোগ করতো আর ৭০ ভাগই করতো পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৪% লোক। আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আমদানি করতো ৫২৯২, মিলিয়ন রুপী আর বিনিময়ে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যেতো ৩১৭৪ মিলিয়ন রুপী। দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০০০ মিলিয়ন রুপীর বেশি। আর ১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মোট ৩০০০ মিলিয়ন পাউনড মূল্যের রিসোর্স পাচার হয়।

সব দপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তান, অনেক পদে নিয়োগ হয়েছে কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই। ২০০০ মাইল দূরে গিয়ে একজন পরীক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা দেয়া ছিল অনেক কঠিন। দুই অঞ্চলের অসমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। শক্তিশালী হতে থাকে উপনিবেশিক ভিত্তি। লেঃ কর্নেল (অব) ওসমানী ছিলেন সর্বোচ্চ সামরিক অফিসার মুক্তিযুদ্ধের সময়। এর উপরে সম্ভবত কেউ যেতে পারেন নি। ১৯৫৬ সাল ঠেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনে বাংলাদেশ থেকে কোটা ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হোতো, মাত্র ৩ জন যুগ্মসচিব ১০ জন উপসচিব আর ৩৮ জন সহকারী সচিব। তার বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তান সচিব- অতিরিক্ত সচিবের সব পদ এবং ৩৮ জন যুগ্মসচিব ১২৩ জন উপসচিব আর ৫১০ জন সহকারী সচিব এর পদ পেতো। অধিকাংশ বাঙালি আমলার দৌড় ছিল সাব-ডিভিশনাল অফিসার লেভেল পর্যন্ত। এই ধরনের অধস্তনতার সংস্কৃতি শুধু উপনিবেশিক ভারতেই সম্ভব ছিল। একসময় ভারতীয় কোনো বিচারক কোনো ইংরেজ অপরাধীর বিরুদ্ধে রায় দিতে পারতো না। ১৯১৭ সালের পর যে কোনো ভারতীয়র জন্য অস্ত্র ক্রয়-বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। স্বাধীন নিখিল পাকিস্তানে যখন এমন বৈষম্য, এমন অসমতা সহ্য করা, কোনো সচেতন বাঙালির পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না।

স্বাভাবিক চিত্র যেখানে বাঙালি অফসারদের চূড়ান্ত নিয়তি লে. কর্নেল অথবা যুগ্ম সচিব। যদিও ৩ জন পূর্ব পাকিস্তানি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ৪-৫ বছরের জন্য। তারা হচ্ছেন খাজা নাজিম উদ্দিন, মোহাম্মদ আলি (বগুড়া) এবং হুসেন শহীদ সোহরাওয়ারদি। প্রথমোক্ত দু’জনই ছিলেন নবাব বংশীয় অভিজাততন্ত্রি উর্দুভাষী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের তল্পিবাহক। তারা কখনো পূর্ববাংলার দুঃখ দুর্দশার সুযোগ পান নি। খাজা নাজিম উদ্দিন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়েই ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির ভাষা মিছিলে গুলি বর্ষণ করা হয়। আর সোহরাওয়ারদি যুক্তফ্রন্ট (আওয়ামিলিগের) প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ থেকে ১৭ অক্টোবর ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। কিন্তু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কারণে তিনিও ব্যর্থ হন।

নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা এগিয়ে আসেনি বাঙালিদের সাহায্য করার জন্য। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২৫০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা সাইক্লোনের ছবি দেখেও তারা প্রথমে ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ১৪ই নভেম্বর নাগাদ এ ঘূর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষ। এটা সরকারি হিসেব, সত্যিকার চিত্র ছিল আরো ভয়াবহ। শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০ লক্ষ। উদ্ধার তৎপরতায় তারা নানা গাফিলতি করতে থাকে। পাশ্চাত্যের উদ্ধারকারি দল চলে আসে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে, কিন্তু তখনো পাকিস্তান সরকার আসে নি। ফ্রান্সের হেলিকপটার মিললো কিন্তু পাকিস্তান আর্মির কোনো হেলকপটার মিলে নি। তাদের গাফিলতির একটি নমুনা ২৮ নভেম্বর ১৯৭০, দি ইকিনমিসট পত্রিকার বরাতে পাওয়া যায়,

“ব্রিটিশ উদ্ধারকারী বিমানগুলো ঢাকায় আটকে পড়ার কারণ- রেডক্রস না সেনাবাহিনী রিলিফ কাজ পরিচালনা করবে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকা।“

মাত্র ২ দিনে দুই লাখ মানুষের মৃত্যুতে তাদের তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে নি। এ রকম নরঘাতকদের কাছে ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

মাওলানা ভাসানি সরকারের পদত্যাগ দাবী করে বলেন, বাঙালির দুঃখের দিনে সরকার সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে নি, অথচ কথায় কথায় জাতীয় সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলা হচ্ছে, এসব সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব বোগাস। তিনি কেন্দ্রীয় বাঙালি মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাঙালি মন্ত্রীরা এমন হৃদয়হীন হতে পারে তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।


দুই অঞ্চলে ফসলের মূল্যস্তরে ছিল বিশাল ফারাক। প্রধান দুটি খাদ্য শস্য ধান এবং গমে পূর্ব পশ্চিমের ব্যবধান ছিল লক্ষণীয়। পশ্চিম পাকিস্তানে যখন ১৮ টাকা মন দরে চাল বিক্রি হোতো তখন পূর্ব পাকিস্তানে তার দাম প্রায় তিন গুন বেশি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। গমের মূল্য যখন পশ্চিম পাকিস্তানে ১০ টাকা মন তখন পূর্ব পাকিস্তানে এর মূল্য ৩৫টাকা মন। একটি দেশের দুই অংশে মূল্য স্তরের এতোটা পার্থক্য থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। মাথাপিছু আয় কম হওয়ার পরেও জীবন যাত্রার ব্যয় ছিল বেশি পূর্ব পাকিস্তানে।

একটি দেশের অর্থনীতির ভেতর অনেকগুলো ফ্যাক্টর অনেকগুলো খাত জড়িত থাকে। এখানে কয়েকটি ইনডিকেটরের আংশিক সংখ্যা তাত্ত্বিক চিত্র দেখানো হয়েছে। এটা খুবই ক্ষুদ্রতম একটা চিত্র। অসমতার পরিধি ছিল অনেক বিশাল। আর তার ফলাফল এসব সংখ্যা দেখে অনুমান করা যাবে না। জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক অবদান রেখেও প্রতি পদে বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বদেশ।

নোটঃ বেশ কয়েকটি উৎস থেকে ডাটা সংগ্রহ করার ফলে কোনো ডাটা যদি পাঠককে কনফিউজ করে তা রেইজ করার জন্য অনুরোধ করা হল আরও নির্ভরযোগ্য ডাটা সগ্রহে থাকলে শেয়ার করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা গেলো।

লিখেছেনঃ  জাফর চৌধূরী

তথ্য সূত্র :

১। মাহবুবুর রহমান, বাংলার ইতিহাস
২। আবদুর রউফ চৌধুরী, ১৯৭১ প্রথম পর্ব
৩। উইকিপিডিয়া
৪।  সুত্র ১
৫। সুত্র ২

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম