জামিলের মুগ্ধতা এবং আমার আবিস্কার

স্কুল থেকে ফিরতেই জামিল দৌড়ে আসলো। ওর আসা দেখেই মনে হচ্ছিল সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে। ছোট্ট জামিল এবার পাচ বছরে পড়েছে। ওকে বিয়াম ল্যাবরেটরীতে ভর্তি করে দেয়া হয়েছে। ও এতো জোরে ছুটে এসেছে যে এখন হাপাচ্ছে।

আমি বললাম রিলাক্স ব্রাদার রিলাক্স।
ও সেই হাপানো অবস্থাতেই বললো রিনাক্স কি করে হবো বলো যা ঘটেছে তা শুনলে তুমিও নিরাক্স হতে পারবানা।
আমি বললাম তুই একবার রিনাক্স আরেকবার নিরাক্স এ কি সব বলছিস?
জামিলের সোজা সাপ্টা উত্তর আরে ওই হলো আরকি। তুমি না বললা লিরাক্স করতে! আমি হেসে উঠে বললাম আরে বুদ্ধু আমি বলেছি রিলাক্স করতে। এবার জামিল হেসে উঠলো।

আর বলোনা কি সব কঠিন কঠিন শব্দ বলো তা কি আর এক বারে বুঝে উঠতে পারি।

আমার ছোট ভাইয়ের এহেন কথা বার্তা শুনে শুনে আমি অভ্যস্ত। আমি ওকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তা কি ঘটছে এবার টকাটক বলে ফেলতো। এবার দেখি ওই আমাকে ভেলকি দেখালো। আমার কথার সুর ধরে আমাকে বললো রিলাক্স ব্রাদার রিলাক্স। তার মানে আমাকে এক্সাইটেড করে তোলার চেষ্টা। আমিও ওকে একটু সুযোগ দিয়ে বললাম তুই যেভাবে বলতে শুরু করেছিলি তাতে কি কেউ রিলাক্স করতে পারে। দ্রুত বল কি ঘটছে। শুরু হলো জামিলের লম্বা চওড়া বক্তব্য।

ভাইয়া জানো সাংঘাতিক কান্ড ঘটে গেছে।

এতো ভনিতা না করে বল কি ঘটেছে।

জামিল তখন বললো রাইয়ানদের বাসায় গেছিলাম ওর সাথে খেলতে। গিয়ে দেখি ওর বড় ভাইয়া এসেছে ঢাকা থেকে। সাথে করে নিয়ে এসেছে কম্পিউটার।

কম্পিউটার কথাটা শুনে আমারও বেশ আগ্রহ জাগলো। কম্পিউটার আশে পাশে কারো নেই।

ও আবার বলতে শুরু করলো জানো ভাইয়া রাইয়ানের বড় ভাইয়া কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। কম্পিউটার চালু করলো আর দেখলাম সেখানে কি একটা ছবি। একটু পরি সে কি ম্যাজিক করলো আর সাথে সাথে সেখানে সেই কম্পিউটারের মধ্যে আমাদেরকেও দেখা গেল। আমরা মুখ ভেংচি কাটলে কম্পিউটারের ভিতরের আমরাও মুখ ভেংচি কাটে।

ওর কথা শুনে আমার কাছেও ম্যাজিকই মনে হতে লাগলো। কম্পিউটার কখনো কাছ থেকে দেখিনি। টিভিতে যা দু একবার দেখেছি। ভীষন আগ্রহী হয়ে উঠলাম কম্পিউটারটা কাছ থেকে দেখার এবং একটু ছুয়ে দেখার। কিন্ত রাইয়ানতো জামিলের বন্ধু তাই ওদের বাসায় ও যখন খুশি যেতে পারে। আমার সাথেতো ওদের কোন যোগাযোগ নেই। কি করে যে যাই।

তা ছাড়া আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়ে জুহি। রাইয়ানের বোন। ও বাসায় গেলে কি না কি মনে করে। আমি কিশোরগঞ্জ সরকারী বালক উচ্চবিদ্যালয়ে এবার ক্লাস টেনে পড়ি আর জুহি শুনেছি এসভিতে ক্লাস নাইনে পড়ে। দু একবার চোখাচোখি হয়নি তা না। মেয়েটাকে বেশ ভালও লাগে আমার।

কিন্ত কিভাবে যে কম্পিউটারটা দেখতে যাই। অদ্রির সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করলাম। ওর যা ফিচকেলে বুদ্ধি নিশ্চই কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। অদ্রিকে বলতেই একটা বায়না ধরে বসলো। যদি ওকে খাওয়াই তাহলে ও বুদ্ধি দিবে। কি আর করা রাজি হলাম। ও বললো চল আমি সাথে যাচ্ছি যা বলার আমি বলবো।

শেষে বিকেলে অদ্রির সাথে জুহিদের বাসায় গেলাম। রাইয়ান তখন জামিলকে নিয়ে খেলছিল। আমাদের বাসা থেকে দু মিনিটের পথ। জামিলতো সকাল বিকাল রাইয়ানের সাথে খেলায় মেতে থাকে। আমাকে আসতে দেখেই জামিল বললো ভাইয়া তুমি কিন্ত সেই কম্পিউটারের জাদুটা দেখে যেও। আমি মাথা নাড়ালাম। শেষে রাইয়ান আর জুহির বড় ভাই জাহিদকে দেখা গেল কম্পিউটার নিয়ে কি যেন করছে।

অদ্রি সালাম দিয়ে বললো ভাইয়া আমরা এ পাড়াতেই থাকি। ও জাহিন,আপনার ছোট ভাই রাইয়ানের বন্ধু জামিলের বড় ভাই। আপনিতো কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার! তাই আপনার কাছে একটা দরকারে আসলাম। উনি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন কি কাজে এসেছি। আমাকে আর কিছু বলতে হলোনা। অদ্রিই সব বললো। যেন কাজটা আসলে ওরই ছিল। ও বললো আমরা একটা কম্পিউটার কিনতে চাই। যেহেতু এ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা তাই আপনার কাছে আসলাম। আপনিতো কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার! আমাদের যদি একটু কম্পিউটার সম্পর্কে ধারনা দিতেন। ওর কথা শুনে জুহির ভাই বেশ খুশি হলেন এবং একে একে আমাদেরকে কম্পিউটারের নানা দিক দেখিয়ে দিলেন। আমিও এটা সেটা প্রশ্ন করে জেনেনিলাম।

শেষে আসলো জামিলের দেখা সেই ম্যাজিক। আমাদেরকে কম্পিউটারের ভিতরে দেখা গেল। আমি ভাবলাম আহ কত বড় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার! হলে আমরা বাইরে দাড়িয়ে থাকলেও আমাদেরকে কম্পিউটারের ভিতরে দেখা যায়। আমাদের মুগ্ধতার যেন শেষ নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম কম্পিউটারের ভিতরে আমাদের দেখা গেল কিভাবে? তিনি বললেন এটা একটা ওয়েব ক্যাম বা ছোট ক্যামেরা। এটার কারণেই তোমাদের দেখা যাচ্ছে।

মনে মনে বললাম এই তাহলে আসল ম্যাজিক! তবে জাহিদ ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং মুগ্ধতা রয়েই গেল। হাজার হলেও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারতো!

আমি বললাম জাহিদ ভাই আপনার মোবাইল নাম্বারটা কি দেয়া যাবে যদি কোন দরকার পড়ে। উনি সাথে সাথে মানি ব্যাগ থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে দিয়ে বললেন এটাতে আমার নাম্বার আছে। আমি কার্ডটা পকেটে ভরেছি হঠাৎ খেয়াল করলাম জাহিদ ভাই কেমন যেন উসখুস করছে। উনি শেষে বলেই ফেললেন।

জাহিন কার্ডটা দিয়ে দাও। আমি তোমাকে কাগজে নাম্বার লিখে দিচ্ছি। আমার কাছে বেশি কার্ড নেই। কখন কোন বড় মানুষকে কার্ড দিতে হয় বলাতো যায়না।

আমি কোন কথা না বাড়িয়ে কার্ডটা বের করে ওনাকে দিয়ে দিলাম। তবে দেয়ার আগে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। আর তখনই আবিস্কার করলাম উনি আসলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার নয়! উনি আসলে ঢাকার নীল ক্ষেতে একটা কম্পিউটারের দোকানের কর্মচারী!!!!!! ওনাদের বাসা থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম বিয়ামের মাঠে। আমার হাসি যেন থামেইনা।

অদ্রি জানতে চাইলো কিরে অমন পাগলের মত হাসছিস কেন? আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম! আগে কথা দে খাওয়াবি তাহলে বলবো। অদ্রি বললো ঠিক আছে আমাকে খাওয়ানোর কথা ছিল সেটা ক্যান্সেল করলাম। এবার বল। আমি তখন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের গোপন তথ্য ফাস করে দিলাম। উনি যে কম্পিউটার অপারেটর এটা জানার পর অদ্রিও তখন হেসে গড়াগড়ি যেতে লাগলো। পরদিন ভোরে ওনার সাথে আমাদের আবার দেখা! আমরা সালাম দিয়ে বললাম কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়া! কেমন আছেন? আমাদের বলার ভংগিতেই উনি বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন যে আমরা ভিজিটিং কার্ডের ব্যাপারটা দেখেছিলাম। জানিনা সেদিন ভোরটা তার কি অস্বস্থিতেইনা কেটেছিল!

জাজাফী # এস এম হল # ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৭ এপ্রিল ২০১৩ সকাল ১০.০২

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম