অপরাজিত

একঃ রাজশাহী ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারে পিএইচডি গবেষণার কাজ সেরে সকাল সাড়ে আটটায় বিনোদপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে বাসে উঠেছিলাম। আমার সিট নাম্বার ছিল ডি-ওয়ান। সিটের কাছে গিয়ে দেখি হলুদ সালোয়ার-কামিজ, চোখে সানগ্লাস পরা এক মেয়ে আমার সিটে বসে আছে। তার বয়স হয়তো চব্বিশ-পচিশ হবে। গা থেকে পারফিউমের ফুরফুরে গন্ধ বের হচ্ছিল।

আমার টিকেটটা বের করে কনফার্মড হয়ে বললাম, এক্সকিউজ মি! আপনার সিট নাম্বার কি ডি-ওয়ান?  মেয়েটি ইতস্তত ভাবে সানগ্লাসের মধ্যে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনার কি ডি টু-তে বসলে খুব সমস্যা হবে? আমি উত্তর না দিয়ে তার পাশে বসে পড়লাম।

মেয়েটি জানতে চাইলো, আপনার নাম কি? কোথায় যাবেন?
কিছুটা অপ্রস্তত হয়ে বললাম, মাহমুদ, মাহমুদ হাসান। ঢাকা যাবো। আপনি?

আমি সুইটি, সুইটি শবনম। এবার বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি চাকরি পেলাম। চট্টগ্রামে পোস্টিং। যোগ দিতে যাচ্ছি।
সবে মাত্র বিসিএস পাস করে চাকরি পাওয়ায় তার আবেগ ও উচ্ছ্বাস কথাবার্তার মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল।

সুইটি নামটি শোনা মাত্রই আমি চমকে উঠলাম। মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো এ মেয়েটি আমার বন্ধু সুমনের বান্ধবী নয় তো? এ সম্ভাবনায় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাড়ি কি গোদাগাড়ী?

মেয়েটি উত্তর দিল, জি, হ্যা। কিন্তু কেন? আপনি কি করে জানলেন?  প্রতিউত্তরে জানালাম, না, এমনিই। আমার পরিচিত একজনকে মনে হলো তো, তাই। আমার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল এ মেয়েটি সেই সুইটি নয়তো? আর সেই সুইটির কথা এক-দুই করে মনে পড়ছিল।  সুইটি শবনম, ডাক নাম মিষ্টি। নামের সঙ্গে ওর চেহারার সঙ্গতি ছিল। সুইটি শবনম আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুমনের বান্ধবী।  ১৯৯৮ সালের কথা। আমি ও সুমন রাজশাহী ইউনিভার্সির ব্যবস্থাপনায় অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সুমনের জীবনের কোনো ঘটনা গোপন ছিল না আমার কাছে।

ক্লাসের মধ্য বিরতিতে আমি, সুমনসহ বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছিলাম স্ন্যাকস এর সামনে বসে। সে সময় স্কুল ড্রেস পরা এবং কাধে স্কুল ব্যাগ ঝোলানো এক মেয়ে একটু দূরে দাড়িয়ে সুমনভাই, এই সুমনভাই বলে চিৎকার করে ডাকছিল।

সুমন বললো, মাহমুদ বসো, আমি একটু আসছি।

দুই-তিন মিনিট পর সুমন ঘুরে এসে আমাকে ডেকে বললো, মাহমুদ, শুনে যাও। কাছে যেতেই ও পরিচয় করিয়ে দিল, এ হলো সুইটি শবনম। আমার ছোট বোন আবার ছোট বন্ধুও বলতে পারো।  সুমন আমাকে ও সুইটিকে নিয়ে সিনেট ভবনের পশ্চিম পাশে চলে এলো। আমরা বসলাম তিনজন। বসা মাত্রই সুইটি কাদতে শুরু করলো। বিরামহীন ভাবে কেদেই যাচ্ছিল। সুমন বার বার জানতে চাইলো, সুইটি, কি হয়েছে তোমার, বলো আমাকে। সুমনকে বললাম, কাদতে দাও। কেদে হালকা হোক, তারপর ও নিজেই বলবে। ও তো বলার জন্যই এসেছে।

কিছু পরে ও মুখ খুললো।  সুমন পকেট থেকে টিসু বের করে দিল। ও চোখ মুছতে মুছতে বললো, সুমনভাই, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন। আজ আমার বিয়ে। আমি পালিয়ে এসেছি। আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না। সুমনভাই, আমি অনেক বড় হতে চাই। আমি বিসিএস পাস করতে চাই।আপনি আমাকে বাচান। এক দমে কথাগুলো বলেই ও সুমনের দুই হাত চেপে ধরলো।

সুইটি ছিল মেধাবী, সুন্দরী, স্মার্ট ও সাহসী।  অল্প সময়ের আলাপচারিতায় আরো বুঝতে পারলাম, সে আত্মবিশ্বাসী। আমি তার কথা শুনে এবং তার আত্মবিশ্বাস বুঝো মোহিত ও মুগ্ধ হলাম। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে এসেও বিসিএসের কথা আমরা এতো দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি না।  সুমনের প্রতি বিশ্বাস এবং আকুতি নিয়ে ও আবারও বললো, সুমনভাই, আমাকে বাচান, আমাকে উদ্ধার করেন। আমি বাড়ি ছেড়ে একেবারে চলে এসেছি। প্রতিষ্ঠা না পেয়ে আমি বাড়ি ফিরবো না।

স্বল্প কথায় সুইটি সম্পর্কে সুমন জানালো, ও আমার পাশের গ্রামের মেয়ে। ওর বাবা হতদরিদ্র দিনমজুর। ওরা চার বোন ও এক ভাই। কিন্তু মেয়েটি খুবই মেধাবী।এবার এসএসসি পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে পাস করেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। আমি আর্থিক ভাবে ওকে সহায়তা করি। কয়েক ছাত্র পড়িয়ে ও লেখাপড়া করে। এতোক্ষণে ওর মনোবল ও দৃঢ়প্রত্যয়ের উৎস খুজে পেলাম আমি। সুইটিকে সুমন অনেকক্ষণ ধরে  বোঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না।  এবার আমি ওকে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে শুরু করলাম। কিন্তু কোনোই ফল হলো না। নিরুপায় হয়ে বললাম, সুমন, বাদ দাও। চলো সুইটিদের বাড়িতে যাই। ওর বাবাকে ম্যানেজ করি।

সুইটি বললো, তাতে কোনো লাভ হবে না মাহমুদভাই। এতোক্ষণে হয়তো বর পক্ষ চলে এসেছে।  কি আর করা! দুজন মিলে বিকল্প পথ খুজতে শুরু করলাম। এমন সময় আমার মনে হলো সুইটি তো নাবালিকা, ওর বিয়ের বয়স হয়নি। তাহলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-র সহায়তায় এ বিয়ে বন্ধ করা যেতে পারে।

আইডিয়াটা সুমনকে জানাতেই ও লাফ দিয়ে উঠে দাড়ালো। মাহমুদ চলো। সে বললো। জরুরি ক্লাস থাকায় আমি অপারগতা প্রকাশ করলাম। সুইটি বললো, ভাইয়া, চলুন না প্লিজ! আমার এই বিপদের সময় আমার পাশে দাড়ান।  এবার আর না করতে পারলামনা। মেইন গেইট থেকে বাস ধরে আমরা গোদাগাড়ী পৌছলাম বেলা তিনটায়। গোদাগাড়ীতে নেমে সুমনদের পরিবারের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও সম্মান সম্পর্কে জানলাম। ওর বাবাকে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা করে।

বাস স্ট্যান্ড থেকে রিকশায় সোজা চলে এলাম আমরা ইউএনও অফিসে। ইউএনও সবে মাত্র মিটিং শেষ করেছিলেন। আমরা ওনার রুমে ঢুকলাম। সুমন পরিচয় দিতেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং বসতে বললেন। সুমন ভূমিকা না টেনে সরাসরি বললো, স্যার, এ মেয়েটির নাম সুইটি শবনম। আমার পাশের গ্রামের মেয়ে। এ বছর স্টার মার্কস পেয়ে এসএসসি পাস করেছে। ওর বাবা আজই ওর বিয়ে ঠিক করেছেন। স্যার, আপনি এ বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন।

একথা শোনার পর থানার ওসিকে ইউএনও ফোন করে ডেকে এনে আমাদের নিয়ে সুইটির বাড়ির দিকে রওনা হলেন। সুইটির বাড়ি পৌছে দেখি চেচামেচি ও হট্টগোল। মেয়ে পালিয়ে গেছে বলে তারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। ঠিক সেই সময় আমরা গিয়ে হাজির হলাম। পুলিশ এবং ইউএনওর গাড়ি এক সঙ্গে দেখে সবাই নীরব হয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো। সুইটির বাবা ও বর পক্ষকে ডেকে ইউএনও এবং ওসি আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দিলেন।

সুইটি কৃতজ্ঞতায় কেদে ফেললো এবং সুমনকে পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করলো। রাতের আহার সেরে আমরা হলে ফিরলাম। আমাদের বাস এগিয়ে চলছিল দ্রূত বেগে। এর চেয়েও দ্রুত গতিতে আমার স্মৃতি রিওয়াইন্ড হচ্ছিল। পকেট থেকে ইয়ারফোনটা বের করে দুই কানে সেট করে মোবাইল ফোনে সংযুক্ত করে ন্যান্সির বাহির বলে দূরে থাক …  গানটা শুনছিলাম।

কিন্তু ছেদ পড়লো মেয়টির ডাকে, এই যে শুনছেন?

আমার কানে হেডফোন থাকায় কেবল তার ঠোট নাড়ানো বুঝতে পারলাম। বাম কানের হেডফোনটা খুলে বললাম, সরি, আমাকে কিছু বলছেন? জি, এখানে তো আপনি ও আমি ছাড়া আর কেউ নেই। মেয়েটি বললো, আপনি গান পছন্দ করেন?  পৃথিবীতে গান শোনে না বা পছন্দ করে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সুতরাং আমিও তার বাইরে নই।

আচ্ছা, বলুন তো চট্টগ্রাম যেতে কতোক্ষণ লাগবে? আমি যদিও ঢাকায় লেখাপড়া শেষ করেছি তবুও কখনো চট্টগ্রামে যাইনি। চট্টগ্রাম পৌছাতে চারটা বা পাচটা বাজতে পারে। মেয়েটির মধ্যে হয়তো একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল মনে হচ্ছিল, এ মেয়েটিই সুমনের বন্ধু সুইটি। আপনার হেডফোনটা আমাকে শেয়ার করবেন? আমি আমার হেডফোনটি খুলে নকিয়া এন সিরিজের মোবাইল ফোনটা আমার প্যান্টের বাম পকেটে রেখে বললাম, এই নিন।

এ মা! আমি তো দুটিই চাইনি। ঠিক আছে নিন, আপনার একঘেয়েমি লাগলে আমি আবার নিয়ে নেবো।

দুই:

সুইটি সম্পর্কে লেখাটি এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে বরং এখান থেকেই শুরু বলা চলে। এরপর দুটি বছর পার হয়ে গেছে। অনার্স শেষ করে সেশন জটে পড়ে এখনো মাস্টার্সেই পড়ে আছি।  সুমন থাকতো হবিবুর রহমান হলে আর আমি এসএম হলে। আমি দ্বিতীয় তলার সিঙ্গল সিটের একটি রুমে থাকতাম। একা থাকতে পারতাম না। তাই কখনো সুমন আবার কখনো অপর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাবনার জিএম সঙ্গে থাকতো।

প্রতিদিনের মতো ডাইনিং রুমে মরিচের পাতলা ঝোল দিয়ে মেশানো এক টুকরো মাংস ও ভাত ডাল এবং কাচা মরিচ দিয়ে খেয়ে আমি আর সুমন শুয়ে ছিলাম। এমন সময় দরজায় নক শুনে দরজা খুলে দেখি কেয়ারটেকার শাহজাহান মামা হলুদ দাত কেলিয়ে হাসছেন। হাসতে হাসতেই রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, সুমনমামা, আপনার গেস্ট আইসেছে।

গেইটের সকল মামাই আমার দুই বন্ধু, সুমন এবং জিএমকে চিনতো।  সুমন নিচে গেল। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। তিন-চার মিনিট পর সুমন ফিরে এসে বললো, মাহমুদ, সুইটি এসেছে।

জিজ্ঞাসা করলাম, কোন সুইটি?  আরে, এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে! আমার এলাকার ওই মেয়েটি, যে … এটুকু বলতেই মনে পড়লো।  চলো নিচে যাই। আমি ওকে গেস্ট রুমে বসিয়ে রেখে এসেছি। আমরা গেস্ট রুমে গিয়ে দেখি সুইটি বসে কাদছে। আমরা কাছে যেতেই ও উঠে দাড়িয়ে সালাম দিল। বসতে বললাম। সুইটির কাছে জানতে চাইলাম, আমার ঠিকানা কি করে পেলে?  ও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, প্রথমে সুজনভাইয়ার হলে যাই। তার রুমমেটরা বলে দিল আপনাকে এখানে পেতে পারি। তারপর রিকশা নিয়ে এখানে।  সুমন জিজ্ঞাসা করলো, কি ব্যাপার সুইটি, এতো বড় ব্যাগ নিয়ে কোথায় চললে?  উত্তরে সেই দুই বছর আগের মতোই ফুপিয়ে কেদে উঠলো। কাদতে কাদতেই বললো, সুমনভাই, আমি আর নিজেকে রক্ষা করতে পারলাম না। জীবন যুদ্ধে হেরে গেলাম।

কেন, কি হয়েছে? সুমন জিজ্ঞাসা করল সুইটিকে।  আমি সুমনকে প্রস্তাব দিলাম, চলো,    ক্যাম্পাসে   গিয়ে    বসি।  সুইটির ব্যাগটা আমার রুমে রেখে আমরা গিয়ে সিলসিলায় বসলাম। সিঙাড়া, কেক আর চায়ের অর্ডার দিলাম।

সুইটি এবার বলো কি হয়েছে তোমার? সুমন আবার জিজ্ঞাসা করলো।

সুমনভাই, বাবা আবার আমার বিয়ে ঠিক করেছেন। আগামীকাল আমার বিয়ে। দুই বছরের আগের মতোই সে আবারও তার সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করলো। তবে এবার সে আরো আত্মবিশ্বাসী। আগের মতোই একই ভঙ্গিতে আকুতি জানালো সুমনকে,সুমনভাই, আপনার কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। আমাকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দেন। আপনি আমার কাছে দেবতা হয়ে থাকবেন।  সুইটি এইচএসসি-তে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করেছে। কিন্তু ওর বাবা কোনো ইউনিভার্সিটি বা মেডিকাল কলেজে ভর্তির আবেদনই করতে দেননি। সুমনের সঙ্গে সুইটির সম্পর্কটা যে কি তা অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েও বুঝতে পারছিলাম না স্রেফ বন্ধুত্ব, না প্রেম? কিন্তু ওর তো অনিকার সঙ্গে অ্যাফেয়ার চলছে!

যাই হোক। এসব ভেবে আমার কাজ নেই। রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান হওয়াতে সুমনের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ছিল শক্তিশালী। সুমন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তা ভুল হোক আর সঠিক হোক। ওর দুই-তিন মিনিট চুপ থাকতে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না, সুমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ও উঠে দাড়িয়ে আমাকে বললো, মাহমুদ চলো। আমরা ঢাকা যাবো সুইটিকে নিয়ে। সুমনের সঙ্গে এতো দিন থেকে জেনে গেছি না করে কোনো লাভ হবে না। তাই ব্যাগ গুছিয়ে মডার্ন এন্টারপ্রাইজ ধরে তিনজন ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম।

আমরা যখন ঢাকা পৌঁছালাম তখন রাত দশটা বাজে। খুব সহজেই বিজয়নগরে একটি হোটেলে ডাবল সিটের একটা রুমে উঠলাম আমরা। হোটেলের রেজিস্টার খাতায় সুমন স্বামী-স্ত্রী এবং আমাকে ওর স্ত্রীর বড় ভাই হিসেবে এন্টৃ করলো।  এক বেডে সুইটি আর অন্য বেডে আমি ও সুমন। সুইটির স্বপ্ন, সুমনের প্রেমিকা অনিকা, আমার ভালোবাসার মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, এসব নিয়ে গল্প করতে করতে তিনজন সারাটি রাত পার করে দিলাম। পরদিন সকালে সুইটিকে নিয়ে আমরা গেলাম নীলক্ষেতের কর্মজীবী মহিলা হস্টেলে। সেখানে সুইটির একটি সিটের ব্যবস্থা হলো। সুইটির নামে সোনালী ব্যাংক নিউ মার্কেট শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলে তাতে পাঁচ হাজার টাকার জমা করলো সুমন।  ওর হাতে চেক বই ও জমা বইটি ধরিয়ে দিয়ে আমরা রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হলাম।  কিছুদিন পরে সুমন জানালো, সুইটি ইডেন কলেজে অর্থনীতিতে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। সুমন পড়ালেখার পাশাপাশি ঠিকাদারি করতো এবং তা থেকে সে সুইটিকে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতো।

এরপর আর সুইটি সম্পর্কে খুব বেশি খোজখবর নেয়া হয়নি বা ওর সঙ্গে আর যোগাযোগও হয়ে ওঠেনি। আমি মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে বিসিএসসহ বিভিন্ন ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্ততি নিতে থাকি। আমার অন্যান্য বন্ধুও পরীক্ষা শেষ করে চাকরি খোজার যুদ্ধে নেমে পড়ে। এসব চিন্তায় ভুলে গেলাম সুইটি শবনমকে।

তিনঃ

পাশের সিটে মেয়েটিকে দেখে আজ আবার সুইটির কথা মনে পড়লো। বার বার মনে হচ্ছিল, এ সুইটিই সেই সুইটি। এসব ভাবতে ভাবতে আমাদের গাড়ি বনপাড়ার বাইপাস সড়কে টার্ন নিল। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েটি হেডফোনটা ফোনটা আমাকে ফিরিয়ে দিল। আমি কোনো ভাবেই কৌতূহল চেপে রাখতে পারছিলাম না। তাই ওটা নিতে নিতে সাহস করে বলেই ফেললাম, আচ্ছা, আপনার নাম কি কেবলই সুইটি শবনম, না মিষ্টি?

মিষ্টি নামটি আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রূ কুচকে সে বললো, হ্যা। কিন্তু আপনি কি করে জানলেন? আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো? আপনাকে আমার খুবই পরিচিত মনে হচ্ছে।  আমি তো বলেছি, আমি মাহমুদ। আচ্ছা, আপনি কি সুমনকে চেনেন? পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি।  এবার কাজ হলো। মেয়েটি সানগ্লাস খুলে আমার দিকে চেয়ে নিবিড় ভাবে আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কি এসএম হলের মাহমুদভাই?  মেয়েটির ওপর রাগ হলো। বিরক্তও হলাম আমাকে না চেনার জন্য।

আমি নীরব থাকায় তার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল এবং সে আবার একই প্রশ্ন করলো। এবার আমি সরাসরিই বলে ফেললাম, হ্যা, আমি সেই মাহমুদভাই। আমার কথা শেষ না হতেই সুইটি আমার হাত দুটি চেপে ধরে বললো, মাহমুদভাই, আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আপনাকে না চিনতে পারার জন্য আমি খুবই লজ্জিত ও দঃখিত। আমাকে ক্ষমা করবেন।

আমি সৌজন্যতার খাতিরে বললাম, ইটস ওকে।

সুইটি স্মার্ট মেয়ে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, মাহমুদভাই, আপনাকে আমি কতো যে খুজেছি! সুমনভাইয়ের কাছে যে কতোবার জানতে চেয়েছি আপনার কথা? সুমনভাই তো আমাকে বলেছিল, আপনি তো জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এখন কি আপনি ব্যাংকেই আছেন?

আমি উত্তর দিলাম, না, আমি বিসিএস পাস করে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে খুলনায় কর্মরত। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর সঙ্গে আলাপচারিতায় অতীতের সেই সুইটিকে খুজে পেলাম। সুইটির কাছে জানতে চাইলাম, তোমার স্বপ্ন কি করে সফল হয়েছে?

সুইটি অবলীলায় বলা শুরু করলো তার সফলতার গল্প।

আপনারা তো আমাকে কর্মজীবী মহিলা হস্টেলে রেখে গেলেন। কিন্তু সেখানে পরিবেশ খারাপ হওয়ায় ছয় মাস পরই সুমনভাই আমাকে ইডেন কলেজের হুস্টেলে সিট করিয়ে দিলেন। সুমনভাই প্রতি মাসে আমাকে টাকা পাঠাতেন এবং কোনো সমস্যায় পড়লেই ছায়ার মতো আমার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। প্রতি মাসে সুমনভাইয়ের টাকায় চলায় আমি হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারি এ কারণে দুটি টিউশনি ঠিক করে দিলেন। একটি সুমনভাইয়ের বড় ভাইয়ের মেয়ে, আরেকটি ওনার বন্ধুর মেয়ে। এ টাকা দিয়ে আমার চলে যাচ্ছিল।

ক্লাস, টিউশনি, পরীক্ষা আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের   জন্য   অধ্যবসায়,  এ  নিয়েই খুব কেটে যাচ্ছিল আমার দিনগুলো। আমার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমি কোনো কিছুই চিন্তা করতাম না। সুমনভাইয়ের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। আমার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো কেবল সুমনভাইকে নিয়েই ভাবতো। তিনি হয়ে উঠলেন আমার ধ্যান-জ্ঞান, বন্ধু, অভিভাবক। এভাবে সুমনভাই ক্রমেই আমার কাছে দেবতা হয়ে উঠলেন।

আমি অনার্স শেষ করলাম। সুমনভাই ইতিমধ্যে একটি এনজিও-তে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন। আমার বিসিএস-এর গাইড,কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সসহ অন্যান্য বইসহ বিসিএসের সার্বিক সাপোর্ট সুমনভাই আমাকে দিতেন। আমি যে এই বিসিএস-এ চাকরি পেলাম তার ফরমও সুমন ভাইয়ের ওঠানো।

সুমনভাইয়ের প্রতি আমার ঋণ বা কৃতজ্ঞতা বলে কিংবা লিখে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। বলতে দ্বিধা নেই, আমি তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লাম। আর হবোই বা না কেন? এতো ঋণ আমি কি দিয়ে কবে শোধ করবো? আদৌ কি শোধ করা সম্ভব! কিন্তু সুমনভাইয়ের পরিবারের কথা ভেবে তার প্রতি আমার দুর্বলতার কথা প্রকাশ করার স্পর্ধা ছিল না। উপরন্তু আমি জানতাম সুমনভাই ও অনিকাআপুর প্রেম চলছিল সাত বছর ধরে।

আমার অনার্স পরীক্ষার পর অনিকাআপুর সঙ্গে সুমনভাইয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। সেই সময় সুমনভাই খুবই ভেঙে পড়লেন। আমি কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পেলাম। আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করলাম সুমনভাইয়ের মন থেকে অনিকা নামটি মুছে দেয়ার। এ জন্য আমি অনেকবার তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছি, কিছুটা হালকাও হয়েছি।

এতো দিনে হয়তো বা পুরুষ রূপী হায়েনারা ছিন্ন-ভিন্ন করে করে আমাকে খেয়ে ফেলতো। হয়তো বা আমার ধর্ষিত দেহটি এতো দিনে বেওয়ারিশ হিসেবে ভাগাড়ে পড়ে থাকতো অথবা আমার আশ্রয় হতো কোনো পতিতালয়ে। সুতরাং নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পেরেছি।

অনিকাআপুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সুমনভাই সিদ্ধান্ত নিলেন কোনোদিনই সংসার করবেন না। এ চিন্তাটা আমাকে পীড়া দিতো। আমার দায়বদ্ধতা থেকেই একদিন বললাম, সুমনভাই, আপনি চাইলে আমি আপনার জীবন সঙ্গিনী হতে পারি।

উত্তরে সুমনভাই বললেন, তোমার-আমার যে বয়স এবং তোমার বর্তমানে যে স্টেটাস, এই অবস্থায় তা আর সম্ভব নয়। তোমার সুন্দর আগামীতে আমি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাই না। তাছাড়া কোনো ব্যক্তিই তার সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে চায় না। তুমি কোনো বিসিএস ক্যাডারকে বিয়ে করো।

তার উদারতায় আমি হেরে গেলাম আবারও। সুমনভাই অনেক বিচক্ষণ ছিলেন। তাই আমার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে আমার কাছে আরো মহান হয়ে রইলেন। তবে সুমনভাইকে সংসারের মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করতে আমি সক্ষম হয়েছিলাম। এখন তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসারী হয়েছেন।এটিই আমার অনেক বড় পাওয়া।

আমি যেখানেই থাকি, যতো দূরে যাই, এ নামটি আমার জীবনে ছায়ার মতোই থাকবে।  আমরা ঢাকায় পৌঁছালাম দুপুর দুটায়। ও অনুরোধ করলো, মাহমুদভাই, আমাকে চট্টগ্রামের একটি বাসে উঠিয়ে দেন।  গাবতলীতে নেমে একটি ট্যাকসি নিয়ে আমরা সায়েদাবাদ পৌছালাম। একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করতে করতে জানতে চাইলাম, আমার বন্ধুর খবর কি?

ওই তো আমাকে রাজশাহীতে বাস টার্মিনালে এসে বাসে উঠিয়ে দিয়ে গেল। কথা শেষ করেই সুইটি মোবাইলে ফোন করলো সুমনকে।
ও ভালো ভাবে ঢাকায় পৌঁছেছে এবং ওর সঙ্গে নাটকীয় ভাবে আমি পাশাপাশি সিটে বসে এসেছি জানিয়ে ফোনটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রায় চার বছর পর সুমনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাই আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছিলাম। এলোমেলো অনেক কথা হলো। শেষ পর্যন্ত একটি কথা বলেই শেষ করলাম, তুমি শেষ পর্যন্ত সুইটিকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুললে?

ও বললো, আরে, আমি আর কি করলাম। ও ওর নিজের যোগ্যতাতেই এ পর্যন্ত এসেছে। লাঞ্চ শেষ করে সুইটিকে চট্টগ্রামের একটি বাসে উঠিয়ে দিলাম।

লিখেছেনঃ সুত্র
এইচএম আকাশ, রাধানগর,
০১৮১২ ০০৬ ৮২৫

 

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম