হাওর কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে

দেশের পূর্ব-উত্তরাংশে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৭টি উপজেলা নিয়ে হাওর এলাকা গঠিত। হাওর একটি চ্যাপ্টা বেসিন, বাটির মতো, যেখানে বছরের প্রায় ছ’ মাসের অধিক পানি থাকে, বাকি ছ’ মাস নদীর পানি ও তলানিতে জমে থাকা পানি দিয়ে চাষাবাদ হয়। বর্ষার ছ’মাসে বলতে গেলে কোন চাষাবাদ হয় না। লোকজন বেকার থাকে। দেশের এক দশমাংশ এলাকা; প্রায় ৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের হাওর এলাকায় প্রায় ১৯.৩৭ মিলিয়ন লোক বসবাস করে এবং মোট ৩৭৩টি হাওর; প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি বিল; ৩৬ হাজারেরও বেশি পুকুর, ডোবা, নালা, খাড়ি রয়েছে।

মোট চাষযোগ্য ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে বছরে প্রায় ৫.২৩ মিলিয়ন টন ধান উত্পাদন হয়। হাওরে শস্য নিবিড়তা (Crop intensity) হচ্ছে ১৪৭%  জিডিপি’তে হাওরের অবদান ০৩% এবং এর ২৫% আসে কৃষি থেকে। আগাম বন্যায় বছরে ক্ষতি-০.৩৩ মিলিয়ন হেক্টর, যার অর্থ মূল্য-৩.৪৮ মিলিয়ন টাকা। এ ক্ষতি জাতীয় কৃষির প্রায় ৩%। হাওরে ৩% লোক ভূমিহীন। কিন্তু ৮১% অকৃষিজীবীর কোন কৃষি জমি নেই। হাওরে বছরে কৃষি জমি কমছে ০.৩৩% হারে। হাওর এলাকায় ৩৪% পরিবার মার্জিনাল কৃষক, ৫% পরিবার জাতীয় লেভেলের নিচে এবং ৫১% পরিবার ক্ষুদ্র কৃষক এবং ২৮% লোক অতি দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে।

হাওরের প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষি দেশের অন্য এলাকা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বছরে সাধারণত একটি ফসল উত্পাদন হয়। মূলত হাওরবাসি কৃষি চাষ ও মত্স্য ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এগুলো নিয়ে অদ্যাবধি তেমন কোন গবেষণা হয়নি। প্রতিষ্ঠিত হয়নি কোন কৃষি বা মত্স্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান। হাওরের অফুরন্ত সম্ভাবনা এখনো অব্যবহূত রয়েছে বলে ওখানে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর জিটিআই-এর প্রফেসর ড. আমির হোসেন বলতেন, ‘সমস্যা যত বড়, সমাধানের পথও তত প্রশস্ত। হাওরের কৃষিকে সাজাতে হবে নতুন আঙ্গিকে, নতুন পরিকল্পনায়, নতুনভাবে।

শুধু ধান চাষ নির্ভরতা কমিয়ে এনে কৃষি বহুমুখীকরণ, যান্ত্রিকীকরণ, সমন্বিত কৃষি, ফসলের নিবিড়তা বাড়ালে মানুষের আয় বাড়বে, দেশ সমৃদ্ধ হবে এবং মানুষ পাবে অধিক পুষ্টি।’ ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমেই বর্ষায় হাওরে সবজি/ফসল ও মত্স্য চাষের পদ্ধতি উদ্ভাবনে সফলতা আসতে পারে। আল্লাহর নিয়ামত হাওরের মিঠা পানিকে আমরা কোন কাজে লাগাতে পারিনি। শুধু ‘ধরিব মাছ, খাইব সুখে’ নীতির ফলে হাওর মত্স্য সম্পদ শূন্য হতে চলেছে। কৃষি বিন্যাস, ফার্মিং সিস্টেম, সমন্বিত বালাই দমন ও শস্য ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করে সারা বছরব্যাপী সক্ষম স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মক্ষেত্র তৈরি সম্ভব। হাওরে ধান রোপণ ও কর্তনের জন্য সহজে চলা ও চালনা উপযোগী যন্ত্র উদ্ভাবন করতে গবেষণা করতে হবে। ‘ডুবা সড়ক’ নতুন যুগের সূচনা করেছে। একে সর্বত্র বিস্তার ঘটাতে হবে।

বিদ্যুত্ বা বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। উপকূল বা পাহাড়ের উপর যত নজর ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, হাওর তত উপেক্ষিত রয়েছে। অনাবৃত রয়েছে এর ধন, ধান, মাছ, গো-সম্পদের শ্বেত বিপ্লব ঘটানো, রূপালী সম্পদের ঝিলিক, সোনায় ভরা, সোনার খনি হাওর। আমাদের দুর্দিনে, জনসংখ্যা বিস্ফোরণে আগামী দিনের খাদ্য ভান্ডার, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার উত্স ভূমিতে রূপান্তর করা সম্ভব আমাদের হাওরাঞ্চলকে। হাওরের জল, জলাশয় ও ভূমির ব্যবহার সম্ভাব্যতা, উত্পাদনশীলতার অংশবিশেষ মাত্র আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি। এ জন্যে হাওর উপযোগী উন্নত জাত, প্রায়োগিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে নিরবছিন্ন গবেষণা দরকার। হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, মিঠাপানি দেশের সম্পদ, খোদার নিয়ামত। হাওর কৃষি গবেষণা এবং হাওর মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাওর নিয়ে অধ্যয়ন/ গবেষণার সুযোগ, এ নিয়ামতের সদ্ব্যবহার বাড়িয়ে দেবে। অথচ হাওরে ওটা সবার আগে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরিভাবে তা এখনই আরম্ভ করা দরকার। এ বিনিয়োগে রিটার্ন হবে বহুমুখী। সস্তা ও উর্বর জমির জন্য এক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে লোকজন হাওরে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন সেখানে উল্টো স্রোত বইছে। হাওরে কৃষি গবেষণার সাফল্যের কারণে ভিটা-বাড়ি ছেড়ে অভিবাসন/ শহরমুখী হাওরের ছিন্নমূল সোনার মানুষদের স্রোত রুখে দেয়া সম্ভব হবে। হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুরগুলো খনন করে দিলে হাওরের ৮০% সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

এ দুর্লভ মুহূর্তে কর্তৃপক্ষের কাছে হাওরের কৃষি উন্নয়নে দেশের সব পাবলিক, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হাওরের সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে গবেষণা করার নির্দেশনা প্রার্থনা করছি। সেইসাথে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হাওর কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানাচ্ছি। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউটে হাওরের কৃষি, মত্স্য, পশু সম্পদ, বন, পরিবেশ, মার্কেটিং, গ্রাম্য আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। হাওরের এ দেশে কৃষি গবেষণা, সমপ্রসারণ ও উদ্বুদ্ধকরণে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার যে শুভযাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা পূর্ণতা পাবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

কৃষিবিদ ও হাওর ভূমিপুত্র
ফোন: ০১৭২৭ ০৭৪ ৫৮৪
ইমেইলঃ niazpasha@yahoo.com

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম