হাওরাঞ্চলে শস্য উৎপাদন বেড়েছে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় দ্বিগুণ

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের হাওরাঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। অথচ একই সময়ে দেশে সার্বিক খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ। কৃষির আধুনিকায়ন বিশেষ করে উচ্চফলনশীল জাত ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ফলে কৃষিতে এ বিপ্লব ঘটেছে। তা ছাড়া সহজ ও সুলভে সেচপাম্প, পাওয়ার টিলার, উফশী বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বোরো মওসুমে দেশের ধান উৎপাদনের সম্ভাবনাময় হচ্ছে হাওরাঞ্চল; যেখানে রয়েছে ৩৭৩টি হাওরে সাত লাখ ৩০ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমি। সেখানে থেকে বছরে মাত্র একটি ফসল আবাদ করে উৎপাদন হয় ৫২ লাখ ৩০ হাজার টন ধান। অথচ বছরের বাকি ছয় মাস প্রায় অব্যবহৃত থেকে এ বিশাল সম্ভাবনার সুফল থেকে জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। এ সময়টা হাওর থাকে মিঠাপানিতে ভরপুর।

এ পানিকে অতি সহজেই সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এ পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং পাহাড়ের ওপর যত নজর ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে- তত বেশি উপেতি হয়েছে এই হাওরাঞ্চল। অনাবৃত রয়েছে এর ধন, ধান, মাছ, গোসম্পদের অপার সম্ভাবনা। এ দিকে হাওর উন্নয়নে সরকারের ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় ১৭টি বিষয়ে ১৫৩টি প্রকল্পে মোট বাজেট ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ৯৬৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। পাঁচ, ১০ ও ২০ বছর (২০১২-২০৩২) মেয়াদি তিন কিস্তিতে তা বাস্তবায়ন করা হবে। মহাপরিকল্পনায় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি উন্নয়নের আওতায় মোট প্রকল্প সংখ্যা হচ্ছে ২০টি। এ জন্য ব্যয় বরাদ্দ দুই হাজার ৩৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এ মহাপরিকল্পনা শুরু হলেও বাজেট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা।

অথচ এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। হাওরের এ মহাযজ্ঞ বাস্তবায়নে হাওর বোর্ডকে শক্তিশালী, নিজস্ব জনবল বাড়ানো, অবিলম্বে কার্যক্রম শুরুর ল্েয বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। মহাপরিকল্পনা এবং আমার স্বপ্ন ‘গ্রাম সৃজন’ বাস্তবায়ন হলে হাওরের চেহারা আমূল পাল্টে যাবে, ঘটবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বর্তমান খাদ্য ভাণ্ডার হাওর আরো মজবুত, পুষ্টিকর, সমৃদ্ধ খাদ্যের উন্নত ও স্থায়ী উৎসে পরিণত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ বিষয়ে হাওর গবেষক কৃষিবিদ ড. নিয়াজ পাশা বলেন, হাওরের অফুরন্ত সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত রয়েছে, সেখানে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি। এ জন্য হাওরের কৃষিকে সাজাতে হবে নতুন আঙ্গিকে, নতুন পরিকল্পনায়। শুধু ধান চাষাবাদের নির্ভরতা কমিয়ে এনে কৃষির বহুমূখীকরণ ও সমন্বিত কৃষির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ফসলের নিবিড়তা বাড়ালে মানুষের আয় বাড়বে, পাবে পুষ্টি। কৃষি বিন্যাস, ফার্মিং সিস্টেম, সমন্বিত বালাই দমন ও শস্য ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করে হাওরবাসী পাবে বছরব্যাপী সম স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন। হাওরে ধান রোপণ ও কর্তনের সহজে চলা ও চালনা উপযোগী যন্ত্র দিতে হবে।

বিদ্যুৎ বা বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। বহুমুখী ব্যবহারের জন্য উঁচু ভিটা, কাটা ধান আনানেয়ার জন্য হালকা কিন্তু টেকসই পরিবহন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। দাদনের ছোবল থেকে রায় ‘হাওর উন্নয়ন ব্যাংক’, হাওর কৃষি গবেষণা এবং হাওর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাওর নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ থাকতে পারে। হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরগুলো খনন করে দিতে পারলে হাওরের ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ড. নিয়াজ পাশা বলেন, আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, হাওরের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও বড় সমস্যা কি? আমি বলব, ‘পানি’।

কারণ হাওরের প্রাণ হচ্ছে পানি। পানিকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয়। এ পানি মাছের খনি, এ খনি থেকে মহামূল্যবান ‘মনি ও মানি’ আহরণ করা সম্ভব। জল, জলা ও চাষ ভূমি সুরায় হাওরে পরিকল্পিতভাবে সুবিধাজনক স্থানে ‘গ্রাম সৃজন’ করতে হবে। নদী বা পুকুর খননের মাটি দিয়ে তৈরি স্বপ্নের এ গ্রামে থাকবে আধুনিক সব সুবিধাসহ বহুস্তর বিশিষ্ট বিল্ডিং। গ্রামের মধ্যে বা চারপাশে থাকবে অনেক পুকুর। পুরো বছর এ পুকুরে বিভিন্ন স্তরে মাছ চাষ হবে, পাড়ে থাকবে বিভিন্ন জাতের ফলগাছ, শাকসবজি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি। একে পরিণত করা হবে পর্যটন বিনোদনের ‘জলপুরী’।

আয় ও খাদ্য উৎপাদন হবে অকল্পনীয়। শুষ্ক মওসুমে ‘ডুবা সড়ক’ এবং বর্ষায় ‘নাও’ বা কোথাও কোথাও থাকবে ‘আভুরা সড়ক’ এর যোগাযোগ ব্যবস্থা। হাওর থেকে উল্টো স্রোত, অন্যত্র অভিবাসন রুখে দিয়ে সারা বছর কর্মম, স্বাচ্ছন্দ্যময়, সম ও উন্নত জীবনযাপনের এটি হবে অন্যতম উপায়।

লিখেছেনঃ আশরাফ আলী

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম