একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সূর্য্য ডোবার কাহিনী

img-6-small580

Shahabuddin Ahmed, Bangladesh, oil on canvas

“Patriots always talk of dying for their country but never of killing for their country.”
কথাটা বলেছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russel).

সব মানুষের ভিতরে প্রেম ব্যাপারটা রক্ষিত থাকে সুপ্ত অবস্থায়, object বা বিষয়বস্তু সামনে চলে এলে এর প্রকাশ পেয়ে যায়। মানুষ তখন প্রেমিক হয়ে ওঠে। আর তাই সমাজের একজন দুষ্ট চরিত্রের মানুষকেও কখনো কখনো প্রেমিক হয়ে উঠতে দেখা যায়। এই প্রেমের অনুভুতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও সে কুন্ঠা বোধ করে না। এই প্রেম হতে পারে একজন নারীর প্রতি, হতে পারে মায়ের প্রতি, সন্তানের প্রতি, দেশের প্রতি। তবে মায়ের জন্য এবং দেশের জন্য যে প্রেমবোধ তার  চারিত্রিক সাদৃশ্য খুবই নিবিড়। সন্তানের জন্মের পরই অথবা সন্তানকে জন্ম দেয়ার পরই মায়ের সঙ্গে সন্তানের প্রেমের বন্ধন তৈরি হয়ে যায়। তেমনি মানুষ যে দেশে বা যে মাটিতে জন্ম নেয় সেই দেশ বা মাটি হয়ে ওঠে তার মাতৃভূমি। মায়ের স্তনদুগ্ধে যেমন সে জীবনকে ধারন করে, বাড়ন্ত করে, তেমনি দেশের মাটি, আকাশ-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি, গাছ-পালা, লতা-গুল্ম তথা সমগ্র পরিপার্শ্বের ভিতরে সে বেড়ে ওঠে এবং অজান্তেই এক গভীর প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই মাতৃপ্রেম এবং দেশপ্রেম তাকে বিভাজিত করতে পারে না, পারে না বিচ্ছিন্ন করতে। আর তাই মায়ের কাছ থেকে সন্তান যখন দুরে চলে যায়, হৃদয়ের গভীরে এক শুন্যতার সৃষ্টি করে যা আকুল হয়ে চোখের জলে ব্যক্ত হয়ে ওঠে। তেমনি দেশ মাতৃকা থেকে যখন কেউ জীবন-জিবিকার প্রয়োজনে বিদেশ-বিভূঁইয়ে পাড়ি জমায় তখন তার হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে ওঠে। আর ভিন্‌ দেশ থেকে কেবলই ক্ষন গননা শুরু হয় কবে দেশে ফিরবে। কিন্তু এ সবই আপেক্ষিক। এই প্রেম এতটাই গভীরে প্রথিত থাকে যে মা বা দেশের মান হানিকর কোন কার্য্যকলাপ যা তাদের অপমানিত করে, ভক্তি-শ্রদ্ধার ব্যত্যয় ঘটায়, তা কখনো বরদাশ্‌ত করতে পারে না। আর পারে না বলেই দেশের জন্য মানুষ জীবন বাজি রাখে মান বাঁচানোর তাগিদে। আর তাই সেই তাগিদ থেকেই সৃষ্টি আমাদের এই বাংলাদেশের।

কিন্তু দীর্ঘকালের পথ পরিক্রমায় আজ  অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে গেছে আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে, সন্তান হিসেবে দেশমাতৃকার জন্য আমরা কি করেছি, কতটুকু করেছি? যে জন্মদাতৃ জন্ম দিয়ে আমাদের করেছে সুমহান, আমরা সেই গর্ব এবং গৌরবকে ধারন করতে পেরেছি কিনা! নাকি কলংক লেপন করেছি দেশমাতৃকার পবিত্র দেহে, নিজেরাই করেছি তাকে অপমানিত? আমাদের যতটা আছে গৌরব, ততই আছে কলংক। এই কলংক লেপন আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি, বুঝে না বুঝে সম্মতি জানিয়েছি, সম্মোহিত থেকেছি। কিন্তু যখন বোধ বা চেতনায় জাগ্রত হয়েছি, দেখেছি দেশ আমার ক্ষত-বিক্ষত পাশবিক ছোবলে। কিন্তু কেন হলো? তা’হলে কি আমাদের দেশপ্রেমে ঘাটতি আছে? বোধে আছে অবিমৃষ্যতা! দেশপ্রেম যদি জীবন দানে উদ্বুদ্ধ করে তবে তার কলংকে কেন চেতনাহীন! যারা মৃত্যু অবধারিত জেনেও শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে বন্দুকের বুলেট ছুড়েছে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন করেছে তারা, সেই মানুষগুলো কি করে চেতনার স্থলনের দর্শক হয়ে যায়, হয়ে যায় সেসবের অংশী? কিন্ত্তু হয় না সবাই। যারা এই সব স্থলন আর বিচ্যুতি সহ্য করতে পারেনি তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে, কেউ নিয়েছে নিভৃত বিজনে স্বেচ্ছা বনবাস।

আমি আজ তেমনি এক মানুষের কথা বলবো। যিনি একজন একাত্তুরের রাজকুমার। অমিত বিক্রম এক মুক্তিযোদ্ধা।

অপরাহ্ন বেলায় আমি চলেছি তার খোঁজে। প্রায় চল্লিশ বছর পর তার সঙ্গে দেখা হবে। আমাদের শহর থেকে বাসে প্রায় আধাঘন্টা। তারপর রিক্সায় আধা কাঁচা-পাকার রা্স্তায় আরও আধা ঘন্টা। বাংলার কোলের উপর দিয়ে রিক্সা চলেছে। দু’দিকে ধানি জমি। আছে ফাঁকে ফাঁকে সরষে ক্ষেতের ছোপছোপ কারুকাজ। যেন    হলুদ আর সবুজের কারুকাজে মায়ের শাড়ীর আঁচল বিছানো!আর স্মৃতি জাগানিয়া মৌ মৌ গন্ধ। আর একটু পরে এই এখানে বিস্তীর্ন প্রান্তে যদি দাঁড়িয়েই থাকি তবে দেখতে পাবো সূর্য্যটা রক্তিম রঙ ছড়িয়ে ডুব দেবে আগামীর কথা জানিয়ে।

যেতে যেতে কত গ্রাম কাছে চলে আসে, দুরে সরে যায় কত। আমি ভাবছি আমাদের শওকত ভাইয়ের কথা। আমাকে চিনতে পারবেন তো! চল্লিশ বছর পর! সেই একাত্তুরে যেদিন আমাদের শহরটা মুক্ত হলো, তখন আমি চৌদ্দ বছরের কিশোর। তাকে দেখেছি কি তেজোদ্দীপ্ত এক পুরুষ। সারা মুখমন্ডল কালো দাড়িতে ঢাকা। লম্বা চুল। সব মুক্তিযোদ্ধার শরীরে তখন সামরিক পোশাক থাকতো না, কিন্তু শওকত ভাইর ছিল। কারন তিনি ছিলেন কমান্ডার। কোম্পানি কমান্ডার। পোশাকের রঙটা ছিল ভিন্ন, কিন্ত্তু ইউনিফর্মড।  কাঁধে ঝোলানো ছিল স্টেন গান। তার চোখের দিকে তাকানো যায়নি, যেন আগুন ঠিকরে বের হবে। তখন শওকত ভাইর মত অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি আর গর্বে বুকটা ভরে গেছে। সংগে ছিল তার কয়েকজন সহযোগী। যেখানে যাচ্ছেন আমরাও সেখানে। আমাকে দেখে শুধু গম্ভির গলায় বলেছিলেন, কেমন আছিস? আমাদের একই পাড়ায় বাসা। বাসায় যেয়ে পাগলের মত এটা সেটা এদিক সেদিক ছুড়ে মারছিলেন। রাগে চিৎকার করছিলেন। কারন হানাদারেরা তাদের বাড়ী ভেঙ্গেচুড়ে লুটপাট করেছে আর  তার বড় ভাই আবদুল্লাহ্‌কে কিছুদিন আগেই পাক বাহিনীরা ধরে নিয়ে বেয়নেটের খোঁচায় হত্যা করেছিল। আবদুল্লাহ্‌ ভাই শওকত ভাইর মত সম্মুখ যুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, কিন্তু ইনফরমার ছিলেন। পাক বাহিনী আর রাজাকারদের গতিবিধির খবরাখবর দিতেন। থাকতেন গ্রামের বাড়ীতে। কিন্ত্তু শেষ রক্ষা করতে পারেন নি। দেশ মুক্ত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তিনি ধরা পড়ে যান। তার মৃতদেহ থানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আমি এবং কয়েকজন বন্ধু মিলে দেখতে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম এক সৌম্য দীপ্ত দামাল যোদ্ধা শুয়ে আছে, বুকে তার ছোপ ছোপ রক্তে রাঙা এক মানচিত্র যেন!

আমি যেতে যেতে ভাবছি চল্লিশ বছর আগের কথা। শওকত ভাই ছিলেন আমাদের অগ্রজ, ৪/৫ বছরের বড়। একই পাড়াতে বসবাস। যখন যুদ্ধে যান, তখন কলেজে পড়েন। টগ্‌বগে তরুন। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরও তিনি আমাদের পাড়াতেই ছিলেন, নিজেদের বাড়িটাতেই। কিন্ত্তু তাকে প্রায়ই বিপর্যস্ত দেখা যেতো। তিনি অনকটাই বদলে গেলেন। একদিন শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ীতে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিলেন।  তখন বুঝিনি কেন তিনি চলে গেলেন! পরে শুনেছি তিনি যুদ্ধোত্তর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন নি। যুদ্ধের ময়দানে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করা এক বীর সেনানী একসময় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন অনেক।  নিজের আদর্শ আর চেতনার সঙ্গে আপোষ করতে পারেননি। অবশেষে একদিন মাটির টানে গ্রামে চলে গেলেন। বিজয়ের মাস আসে আর আমাদের আড্ডা হয় সেইসব বন্ধুদের সংগে আমরা যারা সেই সব ভয়ার্ত কিন্তু উজ্জীবিত দিনগুলির ভিতর দিয়ে দিনাতিপাত করে আজ  এইখানে এসে দাঁড়িয়েছি। এই সেদিনের গালগপ্পে শওকত ভাইর কথা উঠে এলো। কেন যেন আমার মনটা উচাটন হয়ে উঠলো। মাঝে মাঝে কেন যেন নস্টালজিয়া আমাকে এক ঝটকায় অনেক দুরের পিছনের দিনগুলোয় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। খুব ইচ্ছে হলো এই মুক্তিযোদ্ধার পাশে দু’দন্ড বসতে, দু’টো কথা বলতে। অথচ চল্লিশটি বছর তার কথা মনেই পড়ে নি! কিন্তু আজ  তবে কেন? আমরা কি আকালের কালে এসে দাঁড়িয়েছি? আর এতদিন পর যখন দেখবো, কেমন দেখবো তাকে?

ফসলের ক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটা এক সময় গ্রামের ভিতরে ঢুকে পড়লো। এই গ্রামে আমি যেমন আগে কখনো আসিনি, তেমনি শওকত ভাইর বাড়ীও আমি চিনি না। কিন্তু আমার বিশ্বাস একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ী খুঁজে পাওয়া এই বাংলায় কঠিন কিছুই না। ছোটখাটো একটা বাজারের কাছে চলে আসতেই এক দোকানীকে জিজ্ঞেস করতে উল্টো শুধালেন, “শওকত কমান্ডারের বাড়ী যাইবেন?” আমি মাথা নাড়লাম এবং বুঝলাম এই গ্রামে শওকত ভাইর অবস্থান। আজো তাকে কমান্ডার বলেই জানে! আমার চোখের সমনে আবার একাত্তুরের সেই যোদ্ধার প্রতিকৃতি ভেসে উঠলো…শ্মশ্রুমন্ডিত বাবরী চুল, দু’চোখে আগুনঝরা মানুষটি। তার কথামতো সামনে কিছুদুর যেয়ে বাঁ দিকের চাপা রাস্তাটায় নেমে যেতে হবে। রিক্সা বড় রাস্তায় অপেক্ষারত রেখে হেঁটে বাড়ীটির পাশে এসে দাঁড়ালাম। কোন ফটক নেই, খোলা ঢুকে যাওয়ার প্রবেশ পথ। আমি ঢুকে কাউকে না দেখে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষন। শুনশান নিঝুম বাড়ী। কাউকেই দেখছি না। নাকি ব্যস্ত দিনশেষে বিকেলের অবকাশে জিরিয়ে নিচ্ছে বাড়ীটা!

“কে? কাকে চান?” হঠাৎ ভারি কন্ঠ শুনে পিছন ফিরে তাকালাম। তাকিয়ে রইলাম। সেই শ্মশ্রু কিন্তু সবই প্রায় সাদা, সামনের চুলগুলো বিদায় নিয়ে কানের পাশ দিয়ে আর ঘাড়ের উপর স্বাক্ষী হয়ে পড়ে আছে কিছু লম্বা চুল আর চোখ দু’টো তেমনি কিন্তু শান্ত। আমার কোন ভুল হয় নি। সালাম দিয়ে জানালাম আমার পরিচয়।

“ভাই চিন্‌তে পেরেছেন”?

“এত দিন পর সহজেই কাউকে চেনা যায়? অনেক বদলে গেছিস। আয়, ভিতরে আয়।”

তার ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন, কাঠের চেয়ারটা এগিয়ে দিলেন। আমি বসলাম। তিনি কি কারনে আবার ঘরের বাইরে গেলেন। আমি ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলাম। খুবই সাদামাটা আধ গোছানো ঘর। এক কোনে দেখলাম বাঁশের তৈরি ছোট একটা বুকশেল্‌ফ। একটু উঠে চোখ বুলিয়ে নিলাম, কয়েকটি বইয়ের পাশে আছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা মাত্র দু’টি বই।রাজনীতি সম্পর্কীয় বই কিছু, আছে কিছু ধর্মীয় বই, নামাজ শিক্ষা, মিনহাজুল আবেদিন। সেল্‌ফের উপরের তাকে আছে কিছু বাঁধানো ছবি, ছোট ছোট ফ্রেমে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। একটি ফ্রেমে তার নিজের ছবি, সেই একাত্তুরের কমান্ডার। সামরিক পোশাক পড়া, মাথায় ক্যাপ। সব ছবিগুলোতেই প্রায় ধুল পড়ে আছে। এক পাশে একটা টেবিল, তার উপর পানির জগ-গ্লাস, কিছু অসুধের বোতল। একটা পুরোনো খাট পাতা আছে এক কোনে। রান্না ঘরটা সম্ভবতঃ এই ঘরটার পাশেই, ঢুকতেই দেখেছি ছোট ঘরটা। আরেকটি ঘর আছে এই ঘরটার উল্টো দিকে।

তিনি ফিরে এলেন অল্প কিছুক্ষন বাদেই। পাশে বসতে বসতে বললেন, “তুই এসেছিস আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তা’ছাড়া তুই তো কখনোই আসিস নি, আজ  চল্লিশ বছর পর কি মনে করে?”

বললাম, “ভাই আমি কেন এসেছি আমি নিজেও হয়তো জানি না। কেউ একজন যেন আমায় টেনে নিয়ে এসেছে। ক’দিন আগে আমার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যেয়ে পিছনের অনেক কথার মাঝে আপনার কথা চলে এলো। কেন জানি না আপনাকে আরেকবার দেখতে মন চাইলো। কিছু কথা জানতে ইচ্ছে করলো।”

“কি কথা জানতে চাইছিস?”

“ভাই, আপনি এত বড় মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু সব ছেড়ে একদিন এখানে কেন চলে এলেন। আপনি একজন বড় কিছু হতে পারতেন।”

তিনি চকিতে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। চোখে-মুখে হঠাৎ ক্ষোভ নিয়ে বললেন, ” কি হতে পারতাম? একজন নেতা, সমাজপতি? আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া হঠাৎ বিত্তশালী একজন মানুষ? আমি কেন নেতা হতে যাবো? কি কারনে আমি বিত্তবৈভবের মালিক হবো হঠাৎ করেই? আমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম সেই অধিকারে?”

আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি বুঝতে পারলাম তিনি এখন আরও কিছু বলবেন।

কথার ফাঁকে এক কিশোর ঘরে ঢুকলো ট্রে হাতে চা-বিস্কুট নিয়ে। তিনি আমাকে চা নিতে বললেন। চা খেতে খেতে আবার বলে চললেন…”আমরা কয়েকজন বন্ধু ৭ই মার্চ বিকেলে শহরের নিরালার মোড়ে রেষ্টুরেন্টে বসে চা খেতে খেতে বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনছিলাম। ঐ দিনই আমরা বুঝে নেই আমাদের কি করতে হবে। একটা বোধ তৈরী হলো আমার ভিতরে। আমার আর কোন ভবিষ্যত নেই যদি দেশ স্বাধীন না হয়। আর তারই পরিনতিতে ২৫শে মার্চের পর অস্ত্র হাতে তুলে নেই। কলম ফেলে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম ঐ কলম আবার হাতে তুলে নেবো মুক্ত দেশে, এই প্রতিজ্ঞায়।”

তিনি বলতে বলতে বদলে যাচ্ছিলেন। একটু থামলেন। আমি চা’য়ে চুমুক দিলাম। চা’য়ে গ্রামের গন্ধ, দেশের গন্ধ। শওকত ভাইর চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছু বলছি না। ঠান্ডা হয়ে যাক। কোন ছন্দ পতন চাচ্ছি না আমি। তিনি বললেন, “মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটা যে কি রকম এটা বুঝানো যায় না। যুদ্ধ করতে করতে বুঝতে পেরেছি প্রথাগত যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ এক নয়। মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার প্রতি একটা অঙ্গীকার থাকে। পরাধীন থেকে মুক্তির জন্য লড়াই। ক্রলিং করে যখন এগিয়ে গেছি, বুকে বন্দুক নিয়ে গুলি ছুড়ছি…মনে হয়েছে মায়ের কোলে শুয়ে আমি যুদ্ধ করছি। যত ধুলো-মাটি-কাদা গায়ে লেগেছে, মনে হয়েছে এ আমার মায়ের মাটি। কত যে কষ্ট করেছি, খেয়ে না খেয়ে দিন গিয়েছে কত কিন্তু একবারও মনে হয় নি ক্ষুধার কথা। শুধু অপক্ষায় থাকতাম কখন কোথায় অপারেশনে যাবো। নেশার মত মনে হয়েছে। কমান্ডার হয়ে এতগুলো ছেলেদের নিয়ে যতবার অপারেশনে গিয়েছি সবাই পাগলের মত যুদ্ধ করেছে। কতজনে জীবন দিয়েছে, কিছুই পরোয়া করেনি। আমার পাশেই যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলো আমিনুল। চলে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিটও সময় পায় নি। ওর মধ্যেই বললো ‘আপনি মইরেন না, যুদ্ধ চালিয়ে যান’।”

একটু থেমে মাথা নীচু করে কি ভাবলেন। আবার বললেন, যেন নিজের সঙ্গেই, “মরে গেলেই ভাল হতো, শহীদ হয়ে যেতাম। এত অনাচার আর এই বে-ইজ্জতি দেখতে হতো না!”

আমি তাকে দেখছি। মাথা নীচু করেই আছেন। তিনি কি কাঁপছেন! আমি বললাম, “ভাই, এটা কেন বলেন! দেশটা তো স্বাধীন করেছেন। আপনারাই যুদ্ধ করে করেছেন, এই টা তো কম সম্মানের না।”

তিনি আমার দিকে তাকালেন, চোখ দু’টো কি তার আগের মত হয়ে যাবে! বললেন, “দেশ স্বাধীন করছি, না? খুব সম্মানের সঙ্গে আছি, না? তোর কি তাই মনে হয়? বে-ইজ্জতী বুঝস্‌?” একটু থেমেই আবার বললেন, “তোকে এই সব বলে লাভ কি! সবাই তো রঙ বেরঙের বেলুন হাতে নিয়ে স্বাধীনতাকে দেখে। বেলুন মানেই স্বাধীনতা। আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে দেশ? একদিন এই জায়গাটায় এসে দেশ দাঁড়াবে বলেই একটা ভয় নিয়ে আমি সব ছেড়ে-ছুড়ে এখানে এসে বসবাস করছি।” একটু থেমে আবার বললেন, “আমি দেখলাম রক্তের ভিতরে রক্ত! নেতা বদলে গেল, ভাষন বদলে গেল। সব উল্টো কথা বলছে। আর মানুষ! দেখলাম কি ভয়ংকরভাবে মানুষগুলো সেইসব কথায় হাততালি দিচ্ছে! পা টিপে টিপে সেই অসুরেরা ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে, জায়গা করে নিচ্ছে এই দেশের যুদ্ধজয়ী মানুষগুলোর মাঝে। আমি দেখলাম কেউ কিছুই যেন বুঝতে পারছে না! দিন দিন মনে হচ্ছিল যুদ্ধটা যেন একটা খেয়াল, আর কিছুই না! এইটা সম্ভব! হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করছে, লক্ষ কোটি মানুষ পাশে এসে দাঁড়ালো, আর মাত্র কয়েকটা বছরেই সব যেন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেল! এই সেদিনের যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর উপর হাত-পা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সেই হায়নার দল, আর দেশের মানুষ কিছুই বলছে না!” একটু থেমে তিনি আবার বললেন, “মানুষ কি চাইলো কিছুই বুঝলাম না! কত বাদ-মতবাদ, তন্ত্র-মন্ত্র, চারিদিক থেকে যেন দেশটাকে খাবলে খেতে চাইলো। সমাজতন্ত্র, তাও আবার বৈজ্ঞানিক! মার্ক্স-লেনিনকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে নতুন এক তন্ত্র। কিন্তু কি তার উদ্দেশ্য কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু তার জন্য মানুষের ভাগ্য, দেশের ভাগ্য নিয়ে যে ছেলে-খেলা হলো তার হিসাব আর কেউ মিলাইতে পারলো না। কত যে জোয়ান-তাগড়া মানুষগুলা বেঘোরে মারা পড়লো তার হিসাব কেউ রাখলো না। একদিন সব তন্ত্র-মন্ত্র উধাও হয়ে গেল।”

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোফাজ্জলের কথা মনে আছে তোর? সেই রাস্তার ওপারে বাড়িটা।” আমি বুঝতে পারলাম কার কথা বলছেন। আমি মাথা নাড়লাম। “সেই তোফাজ্জল, কি মেধাবী ছাত্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বৈজ্ঞানিকে নাম লেখালো। কি খুঁজে পেলো! তারপর একদিন সে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে গেল!”

আমি এই তোফাজ্জল ভাইকে চিনি। শওকত ভাই হয়তো জানেন না তিনি আমার দু্ঃসম্পর্কের ফুফাতো ভাই। একই পাড়ায় রাস্তার ওপারে থাকতেন। বাবা-মা’য়ের দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী আর ভদ্র ছিলেন। মিতভাষী, কিন্তু সবসময় ছোট্ট হাসি দিয়ে কথা বলতেন। রাস্তা দিয়ে যখন হেঁটে যেতেন, মাথা অনেকটা নীচু করে সোজা সামনের দিকে তাকিয় হাঁটতেন। দেখে একেবারেই বুঝার উপায় ছিল না যে তিনি আন্ডার গ্রাউন্ডের কাজ করেন। মাঝে মাঝেই ডুব দিতেন আবার ফিরে আসতেন। একদিন সেই যে গেলেন আর ফিরলেন না। বাবা-মা প্রায় পাগলপারা। আমরা তখনই শুধু জানতে পারলাম তার গোপন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা।

শওকাত ভাই বললেন, ” তোফাজ্জল আন্ডার গ্রাউন্ডে যেয়ে একদিন হারিয়ে গেল। আমার কিছু লোকজন নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য কেউ রাজনীতিতে নামলো, কেউ ব্যবসায়ী আর কেউ অন্ধকারের রাস্তা ধরলো। তারপর এক সময় দেশটাই কব্‌জা হয়ে গেল তাদের হাতে যাদের পায়ের নীচে মাটি থাকার কথা ছিল না। এইসব দেখে আমি পালাই নি, তবে লজ্জায় একরকম নির্বাসন নিয়েছি। কেবলই ভেবেছি কেন যুদ্ধ করেছি, এত রক্তের বন্যা কেন বয়ে গেল এই দেশে? সব যখন একাকার হয়ে যায় তখন মনে হয় তবে যুদ্ধের কি প্রয়োজন ছিল?” একটু থেমে তিনি আবার বললেন, “আমি মাঝে মাঝে ঐ রাস্তার পাশটাতে বসে মানুষগুলার আসা-যাওয়া দেখি, ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। হিসাব মিলাতে পরিনা এরাই কি সেই মানুষ যারা একাত্তুরে সব একজোট হয়ে গেছিল! আমরা যখনি যেসব জায়গা মুক্ত করছি সেখানে আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরছে। হিসাব মিলাতে পারি না। সৃষ্টিকর্তা মনে হয় আমাদের সেই স্মৃতিশক্তিটুকু দেয় নাই যে গৌরবের কথাগুলো মনে রাখবো। আমরা নিজেরাই নিজেদের বলাৎকার করি। গৌরব আর কলংক কখন এক হয়ে মিশে গেছে আমরা বুঝতে পারি না। খুব লজ্জা হয়! আমি লজ্জা নিয়ে বেঁচে আছি এই চল্লিশটি বছর। যুদ্ধের ময়দানে মরে গেলে কত ভাল হতো! লজ্জা থেকে বেঁচে যেতাম।”

 আমি নিশ্চল হয়ে শুনছিলাম অনেকক্ষন। একজন বীর যোদ্ধার বীরত্বের কথা শুনবো কি, শুনলাম তার লজ্জার কথা। আর তাই তার এই নিভৃত জীবন যাপন।

রিক্সা ছুটে চলেছে আবার ফেরার পথে। বিদায় নেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম ব্যক্তিগত জীবনের কথা। জেনেছি, ভাবী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর। দীর্ঘ রোগভোগের পর। একমাত্র ছেলে বি,এ পাশ দিয়ে গ্রামেরই এক স্কুলে মাষ্টারি করছে। একটু অপেক্ষো করলেই হয়তো দেখা হতো। কাজের ছেলে আছে একটা, বাড়ি আর ক্ষেত খামারের দেখা-শুনা করে।

অনেক প্রশ্ন এখন আমার ভিতরেও উড়াউড়ি করছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো কি আগেও জানান দিয়েছে আমাকে কখনো? কি জানি। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। দুরের আকাশটা লাল হয়ে এসেছে। একটু পরেই সূর্য্য ডুববে প্রতিদিনের মত। ফিরে যাওয়াটা এত মলিন! “মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি…”। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম