হাওর ভাটির জলবায়ু ন্যায়বিচার – পাভেল পার্থ

বাংলাদেশে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড দেশে ৪১৪টি হাওর আছে বলে তাদের এক দলিলে উলেল্গখ করে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৪২৩টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরের সম্মিলিত আয়তন প্রায় ৮ হাজার বর্গকিমি এবং এগুলো সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪৮টি উপজেলায় বিস্তৃত। দেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের একভাগ জুড়ে এই হাওরাঞ্চলে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। হাওরাঞ্চলের জনগণ মূলত দুটি ঋতুকে প্রধান করে ভাগ করেন, একটি বর্ষা আরেকটি হেমন্ত। বর্ষায় উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি বালিসহ পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে ভেসে যায় হাওরের নিম্নাঞ্চল। আর হেমন্তে ভাটিবাংলা এক ফটফটা শুষ্ক ভূমি। এককালে হাওরে জন্মাত টেপি, বোরো, রাতা, শাইল, লাখাই, মুরালী, চেংড়ি, সমুদ্রফেনা, হাসিকলমী, কাশিয়াবিন্ন, দুধরাকি, দুধসাগর, লাটলি, মারতি, তুলসীমালা, আখনিশাইল, গাছমালা, খৈয়াবোরো, রাতাশাইল, দেউড়ি, কন্যাশাইল, বিচিবোরো, লোলাটেপি, পশুশাইল, হাঁসের ডিম, গুয়ারশাইল, বেতি, ময়নাশাইল, গদালাকি, বিরঅইন, খিলই, ছিরমইন, আগুনী, গুলটিহি, ল্যাঠা, জাগলিবোরোর মতো অবিস্মরণীয় সব গভীর পানির ধান জাত।

উপমহাদেশের প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে হাওরের হবিগঞ্জ জেলার নাগুড়াতে। প্রশ্নহীনভাবে সেই প্রতিষ্ঠানকে বদলে তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র। গবেষণা ও উন্নয়নের নাম করে গভীর পানির ধান জাতগুলো ডাকাতি করেছে ফিলিপাইনে অবস্থিত (ইরি) ও সিজিআইএআরের মতো প্রতিষ্ঠান। ধান বাদে হাওর জলাভূমির এক অনন্য সম্পদ মাছসহ এর জলজ প্রাণবৈচিত্র্য। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ দেখা যেত একটা সময়। মৎস্য প্রজাতির অধিকাংশই একটা সময় পাওয়া যেত ভাটিবাংলার হাওর জলাভূমিতে। বাংলাদেশ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন সুনামগঞ্জ কমিউনিটিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অন্তর্গত ফিশারিজ রিসার্চ সাপোর্ট প্রজেক্ট-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ডফিস সেন্টার কর্তৃক ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শুধু সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওর ও বিল হতে ১২২ প্রজাতির মাছ রেকর্ড করা হয়েছে। হাওর জলাভূমির এক অবিস্মরণীয় ভৌগোলিক নির্দেশনা নানিদ মাছ হাওর এলাকা থেকে সম্পূর্ণত বিলুপ্ত হয়েছে। হাওরের চিতল, বাঘাইর, মহাশোল, বেরকুল, এলং, বামস, রানী, আলুনি, সিলং, বাছা, ঘাইরা, চিরাই, দেশি পাঙ্গাশ, গাং মাগুর, কোটা কুমিরের খিল, ঘাঘলা, ঘোড়ামুখ, রিঠা, আগুনচোখা, আইড়, গুতুমমাছ এগুলোও হাওর থেকে হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ষাটের দশকের পর তথাকথিত সবুজ বিপল্গবের নামে রাষ্ট্রের মাধ্যমে করপোরেট রাসায়নিক কৃষি চালু হওয়ায় বাংলাদেশের হাকালুকি, হাইল, শনির, দেখার, টাঙ্গুয়ার, পচাশোল, সজনার মতো বৈশিষ্ট্যময় হাওরগুলোতেও জমেছে করপোরেট কোম্পানির বিষ। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। আবার অন্যদিকে এই এলাকায় দেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগান হওয়ায় এই এলাকায় মনসান্টো কোম্পানির রাউন্ডআপসহ সর্বনাশা সব করপোরেট বিষ ব্যবহারের অনুমোদন করেছে সরকারের চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।

মেঘালয় পাহাড়ে অন্যায় ও অপরিকল্পিত করপোরেট কয়লা, পাথর ও ইউরেনিয়াম খনির ফলে ভাটিবাংলার হাওর জলাভূমি প্রশ্নহীনভাবে জখম হচ্ছে দিনের পর দিন। হাওরাঞ্চলের এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য করচ-হিজল-বরুণ-নল-নটা-খাগের জলাবন। হাওরাঞ্চলের বহিরাগত সেটেলার বাঙালি এবং সিলেট কাগজ তৈরির মন্ড কারখানা প্রশ্নহীন কায়দায় ভাটিবাংলার জলাবনকে নিশ্চিহ্ন করেছে। হাওরের ধান-মাছ-বন-জলসহ প্রাণসম্পদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হাওরবাসীরা এভাবেই দিনে দিনে হাওরের সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক করপোরেট বিশ্বায়িত দুনিয়ার পুতুল নাগরিকে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছেন। হাওরের প্রতিটি প্রাণসম্পদে ভাটি অঞ্চলের এই রক্তাক্ত করুণ ইতিহাস লেখা আছে। আর এভাবেই হাওরাঞ্চলের বিরাজমান জলবায়ু পঞ্জিকা দিন দিন নৃশংস কায়দায় খুন হয়েছে। ধনী ও তথাকথিত আধুনিক দেশের লাগামহীন ভোগ-বিলাসিতা এবং অন্যায় বাণিজ্যিক মুনাফাই হাওরসহ দুনিয়ার জলবায়ু ধারাবাহিকতা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। হাওর-ভাটি অঞ্চলের জনগণ এই জলবায়ু জখমের জন্য কোনোভাবেই দায়ী না হলেও হাওর-ভাটির মানুষেরাই প্রশ্নহীন কায়দায় এই ‘জলবায়ু পরিবর্তনের’ অনিবার্য শিকার। কৃষক-মৎস্যজীবীসহ হাওরনির্ভর জনগণ জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রতিটি আহাজারি নিজের কলিজা ও শিরায় টের পান। রক্তাক্ত জলবায়ুতে হাওরাঞ্চলে চলতি সময়ে কৃষিক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে নানাবিধ সমস্যা। বেশ কয়েক বছর ধরে হাওরাঞ্চলে ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনগুলো বোঝা যাচ্ছে না। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

হাওরের অনেক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং পানিশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে, যা ভাটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক প্রতিবেশীয় বৈশিষ্ট্যকে বিপন্ন করেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পানির তাপের তারতম্য দেখা দিচ্ছে। যার ফলে বিগত কয়েক বছর যাবৎ হাওরাঞ্চলে ঘনিয়াসহ ব্যাপক মাছের গণমৃত্যু ঘটেছে। হাওরপাড়ের ঐতিহ্যগত প্রবীণ জেলেদের কাছ থেকে জানা গেছে, হাওর এলাকায় তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ব্যাপক অনিয়মের ফলে মাছের প্রাকৃতিক প্রজননে ব্যাঘাত ঘটছে। সুনামগঞ্জ এবং সিলেটের হাওরাঞ্চলের কাছাকাছি উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের অন্যায় ও অপরিকল্পিত কয়লা-পাথর এবং ইউরেনিয়াম খনি। এসব করপোরেট খনির ফলে স্থানীয় এলাকাতেও বদলে যাচ্ছে আবহাওয়া। প্রশ্নহীনভাবে মেঘালয় পাহাড়ের বালিতে ডুবে যাচ্ছে হাওর-ভাটির জনপদ। ২০ জুলাই ২০০৮ তারিখে করপোরেট খননে ফাঁপা মেঘালয় পাহাড় ধসে পড়ে বাংলাদেশের ওপর। নিশ্চিহ্ন হয় একরের পর একর কৃষিজমি, গ্রামের পর গ্রাম, জলাভূমি এবং জীবন-জীবিকা। মেঘালয় পাহাড়ের নিচে বাংলাদেশের সীমান্ত জনগণের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় গরমকালে এত তীব্র গরম এবং শীতকালে এত তীব্র শীত এখন থেকে মাত্র ২০ বছর আগেও এতটা দেখা যায়নি। মেঘালয় পাহাড়ের প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড় এবং লাফার্জসহ করপোরেট খনি কোম্পানির কয়লা-পাথর উত্তোলনের ফলে মেঘালয় পাহাড়ের উজান-ভাটিতে আবহাওয়ার এই বিপর্যয় চলতি সময়ে প্রবল হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বাড়ছে ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা, রক্তচাপ, চর্মরোগসহ নানা নিত্যনতুন অসুখ। জলের তাপমাত্রার অতি সামান্য পরিবর্তন মাছসহ জলজ প্রাণবৈচিত্র্যর জন্য এক কঠিন হুমকি। ভাটি-বাংলার লড়াই করে টিকে থাকা মাছবৈচিত্র্যকে এই আবহাওয়াগত পরিবর্তনকে সামাল দিতে হচ্ছে। জলবায়ু জখমের ফলে হাওরাঞ্চলের কৃষি এক বিপন্ন সীমায় চলে গেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ধানের ফলনের তারতম্য হচ্ছে। হঠাৎ অবিশ্বাস্য রকমের কুয়াশা এবং ঠাণ্ডা তাপমাত্রার জন্য ধানের ফুল ফোটার সময়কালের পরিবর্তন ঘটল।

এভাবে অনেক হাওরেই ধানের ভেতর দানা না জমে ধান চিটাতে পরিণত হয়। ফলে হাওরাঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরে ফসল তোলার পরপর আবার দেখা দিয়েছে খাদ্যহীন এবং নীরব আকাল। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে হাওরাঞ্চলে জলবায়ু জখমগুলো আমি টের পেয়েছি স্থানীয় প্রতিবেশের রক্তাক্ত বিশৃঙ্খলতায়। হিজল এবং করচের ফুল ফুটতে দেরি হচ্ছে। বরুণ গাছের ফলের রঙ ও গন্ধে পরিবর্তন ঘটেছে। হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এখনও পর্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। হাওরের কৃষি প্রতিবেশকে বিবেচনা না করে হাওর এলাকায় গভীর পানির দেশীয় ধানজাতকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকার এখনও চালু রেখেছে করপোরেট রাসায়নিক কৃষি। হাওরাঞ্চলে সিনজেন্টা কোম্পানির একচেটিয়া করপোরেট বাণিজ্যের বৈধতা তৈরি করেছে এই দরিদ্র স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র। কোপেনহেগেনে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বিপন্ন অবস্থার কথা বলা হচ্ছে বারবার। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও তার জলবায়ু সুবিচারের প্রসঙ্গ জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য জরুরি হবে দেশের সব কৃষি প্রতিবেশ এবং অঞ্চল ভিন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনগণবান্ধব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। হাওরাঞ্চলের জনগণের রয়েছে ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার এক অবিস্মরণীয় বিরাজমানতা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে হাওরাঞ্চলের জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য এই ঐতিহাসিক লোকায়ত বিরাজমানতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বর্ষার ভাসান পানিতে মাছ ধরার প্রথাগত রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে হাওরের প্রান্তিক জনগণ সংগঠিত হয়েছেন নানা সময়।

হাওরের নিম্নবর্গ মানুষের এই প্রতিরোধ দুনিয়ার শ্রেণীবিপল্গবের ইতিহাসে এক প্রতিবেশ-রাজনৈতিক আখ্যান। হাওরাঞ্চলের নিম্নবর্গের এসব লড়াই আপন জলবায়ুকে আপন কায়দায় বিরাজিত রাখার রাজনৈতিক নির্দেশনা। জলবায়ু বিপন্ন এই সময়ে হাওরাঞ্চলের জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনকে হাওরাঞ্চলের ঐতিহাসিক জননির্দেশনাগুলোকে কার্যকরভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবেই হবে।

পাভেল পার্থ – গবেষক, ১৩ ডিসেম্বর ২০০৯ সমকালে প্রকাশিত

1 Response for “হাওর ভাটির জলবায়ু ন্যায়বিচার – পাভেল পার্থ”

  1. Md. Zahangir Alam বলেছেন:

    Im very interested to read and use for refference Pavel Partha’s articles. We want more. This article is focusing the real climate scenario of haor. Thanks for this very important article.

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম