তুফাইন্যা কসাই

তুফাইন্যা কসাইকুড়ি, চল্লিশটি পাকা কাঁঠালের মধ্যে সদ্য প্রলেপের বিভিন্ন কাঁচা রঙের একটা বাইসাইকেল ট্রলার (ইঞ্জিন চালিত নৌকা) ছাদে ঠাই করে নিয়েছে। কাঁঠাল গন্ধের সাথে সাইকেল রঙের গন্ধ মিলেমিশে দারুন একটা ফিউশন সুবাস আমার ঘ্রান ইন্দ্রিয় স্পেক্ট্রামের কোথায় জেনো একটা তালগোল পাকিয়ে সুবাসটির যোগ সুত্রিতা অনুসন্ধানে যারপর নাই ক্রসরেফারেন্স সূচকটি মস্তিস্কে সংরক্ষিত বিক্ষিপ্ত ঘটনাবলীতে ঢুঁ মেরে যাচ্ছে অবিরত। ব্যাপারটী অন্য কারো বেলায় ঘটলে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো জানা নেই, আমার বেলায় এমন পরিস্থিতিতে নিজকে অনেক অসহায় মনে হয়; মুক্তির জন্য চেষ্টায় আছি, হাওড়ের জলে ইঞ্জিন নির্গত ধোয়ায় সৃষ্ট বাতাস চাপে আন্দোলিত বিভিন্ন নকশার ব্যপ্তিকালে, কি দারুন নকশা’র জন্ম হচ্ছে জলের বুক চিঁড়ে কিছু দূর দৌড়ে যাচ্ছে, পেছন পেছন আরেকটি নতুন নকশার জন্ম হচ্ছে, পুরানটীর সাথে নতুনটি ছোঁয়াছুঁয়ি মাত্রই পুড়ানো টি মিলিয়ে যাচ্ছে অগাধ জলরাশিতে- দৃষ্টিটাও নিমগ্ন রাখতে পারছি না- কি যে দূর্দান্ত রঙ আর কাঁঠালের সুবাস!
পড়ন্ত বেলা ধুপ ধুপ করে এগিয়ে চলছে ট্রলার, ছাদের যাত্রী’রা কেউ তেমন কথা বার্তা বলছে না। থুতনি দাড়ির ছেঁড়া পাঞ্জাবী’র শীর্নকায় লোকটা অপর দিকের রেলিং’য়ে বসে মাঝে মধ্যে আমার দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিন/পত্রিকা বের করার ভনিতা’তায় উনার কাছা কাছি গিয়ে বসি। লোকটি হাস্যোজ্বল হয়। আমি ম্যাগাজিন এর পাতা’তে চোখ রাখতে’ই শুনি-
-বাইছাব, ও বাইছাব!
-জ্বী বলুন।
-ভয়ে বলতাম, না নির্ভয়ে বলতাম!
-আরে ভাই কি যে কন (বলেন) আমাকে ভয় পাওয়ার কি আছে?
দেখি লোকটা নিজের দু’হাতের তালু কচলিয়ে এক্কবারে কাচুমাচু হওয়ার উপক্রম
-আমার নামডা অইলো তুফাইন্যা কসাই।
আমি বলি আপানার নাম তো আমি অনেক শুনেছি আপানার দোকান থিক্যাই তো বাড়ীতে গোশত আসে।-কইন কি’তা বাইয়ু (ভাই) আস্তা গরু ছাগল কাইট্টা লাইইনের (কাটার) মানুষ অইলাইন (হলেন) গিয়া আফনে (আপনি) আর আমার সাতে কতা কওনের লেইজ্ঞা আফনে লুঙ্গী নাফাক (নাপাক) করনের কারবার করতাছুইন, খুইল্ল্যা কইনছে ভাই-
আমার কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠেন তুফাইন্যা কসাই। বলতে শুরু করেন-
-আমি তো ভাই হুনছি আফনে আম্রিকান মানুষ, গেইটলক বাড়ীর ভিতরে থাকুইন, মাম বোতলের পানি দিয়ে বুর (গোসল) করেন। মাথা জইল্ল্যায়া (দুলিয়ে) বিদিশি গান হুনেন (শোনেন)।
কসাই এর কথা গুলু’তে আমি আকাশ থেকে পরছি- তারপরে আর কি শুনেন!
-আফনে নাকি অনেক খরাপ (খারাপ) মানুষ-
-তারপর-
-সিদ্ধি টিদ্ধি (গাঁজা)নেশা কইরা মানুষ জনেরে পিডান (পেটান)।
মনে মনে ভাবছি এই একটা অতি সাধারন কসাইয়ের কাছে আমার এই ভয়াবহ ভাব মুর্তিটি কেই বা তুলে ধরতে পারে! আবার কারনটাই বা কি হতে পারে। যাক আমার এলাকায় গ্রাম্য রাজনিতীতে এক পক্ষের কাছে আরেক পক্ষ কে ঘায়েল করনে “খরাফ” বানানোর এই কৌশলটা বেশ বহু বছর ধরেই প্রচলিত। তাই আমি চেষ্টাও করলাম না, কারন আমার রুদ্রাক্ষের মালায় চুল দাঁড়ি গুম্ফ সমেত চেহারা সুরতে কসাই ভাইয়ের কাছে প্রথম শ্রেনীর ম্যাজিষ্ট্রেট কতৃক সতায়্যিত চারিত্রিক সনদ পেশ করলেও আমার সমন্ধে উনার বোধে “খরাপ মানুষ” টা সহজে দূর করা হবে মোটামোটি বৃথা। বললাম-
-না ভাই নির্ভয়ে বলতে পারেন, বলুন।
-বাইছাব আফনেরা অইলেন গিয়া শিক্ষিত মানুষ নিজে ত আর লেহা পড়া জানিনা। মুর্খ্যু মানুষ জমের সমান- আমার পুলাডা কেলাস সেবেন (সেভেন) ও উঠছে, বায়না দরছে নয়া বাইসাইকেল দেওন লাগবো। ম্যালা দিন বাইল বুগা (আশা্তে ঘুড়ানো) দিয়া গুরাইছি। গত সপ্তাহে পুলাডার উঠলো জ্বর, ম্যালা জ্বর রাইতে তো জ্বরের মইদ্যে (ঘোরে) কি-রি-ং , কি-রি-ং কইরা পুলাডার কি চিক্কুইর- জিগাইলাম বা’জান ও বা’জান কিতার (কিসের) কিরিং! কইলো মেঘের রাইজ্যে নয়া সাইকেল কিরিং, কি-রি-ং। পুলাডা’র জ্বর ছারতেই আর দিরং(দেরী) করি নাই। নয়া বাইসাইকল কিনার তো সামর্থ্য নাই, মুড়িকান্দি বাজার থেইকা পুড়ানই একটা কিনলাম। বুজতে পারলে রাগ করবো। হের লাইগা নিজেই রং চং মারলাম, কেমুন হইলো সাইকেলটা, বাইছাব?
-আরে চমতকার, অনেক সুন্দর সাইকেল, আফনের ছেলে অনেক পছন্দ করবো
-অংকা (এখন) রংডা জলদি শুকাইলেই অয়!
ইতিমধ্যে কেবলা নিশানায় মাগরিবের আযান দাঁড়িয়ে গিয়েছেন একজন- আস্তে আস্তে সবাই দাঁড়িয়েছে পেছেনে, নামাযে। আমি নামাজ পড়ি না। তুফাইন্যা কসাই এর কাছে মানুষ পেটানো খরাফ মানুষের পরিচিতি টা আরো পাকা পোক্ত হওয়ায় আশকাংয় কিছুটা বিব্রত বোধ করি। নামাজ শেষ, যার যার পুটলী তে রাখা নিয়ে আসা মুড়ি, পেয়াজু বের হচ্ছে। তুফাইন্যা কসাই, বলছে-
বাইসাব, আফনের পত্রিকাডা বিছাই?
মাথা নেড়ে সম্মতি দেই, আমি ছাড়া প্রায় সবার ইফতারি উপাদান পত্রিকার উপর জমা হয়। নিজেকে তখন প্রচন্ড “খরাপ” ভাবতে শুরু করি। অনেক ভেবে চিন্তে ব্যাগ থেকে সাথে আনা কয়েক বোতল পানি, ইফতারের সাথে রাখি। আমি আকাশের দিকে তাকাই পশ্চিমাকাশে তখন বাইসাইকেল’টার ছোপ ছোপ কাঁচা রঙের ছড়াছড়ি, ভেতর থেকে খিল খিল করে কেউ যেনো বলো ঊঠলো মেঘের রাইজ্যে নয়া সাইকেল- কি-রি-ং… কি–রি—ং

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম