কিশোরগঞ্জ জেলা

কিশোরগঞ্জ জেলা (ঢাকা বিভাগ) আয়তন ২৬৮৮.৬২ বর্গ কিঃমি। উত্তরে নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলা, দক্ষিন পশ্চিমে নরসিংদী জেলা, দক্ষিন পুর্বে ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলা, পুর্বে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে গাজীপুর জেলা। কিশোরগঞ্জ জেলা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র মেঘনাসহ বিভিন্ন ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদীর পলল বিধৌত বেঁলে দো-আঁশ বা এটেল মাটি দিয়ে গঠিত। ফলে ভূমি খুবই ঊর্বর।

প্রধান নদনদী:

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র , মেঘনা, কালনী, ঘোড়াউতরা, নরসুন্ধা, ধনু ও পিয়াইন। হুমাইপুর হাওর (বাজিতপুর), সোমাই হাওর (অষ্ট্রগ্রাম), বাড়ির হাওর (মিটামইন),তল্লার হাওর (নিকলী-বাজিতপুর-অষ্ট্রগ্রাম), সুরমা বাউলা হাওর (নিকলী) উল্লেখযোগ্য। বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২.১ ডিগ্রি সেঃ এবং সর্বনিম্ন ১০.৬ ডিগ্রি সেঃ । বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২২৩২ মিঃমি।

কিশোরগঞ্জ শহরঃ

কিশোরগঞ্জ শহর কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সৃষ্টি ১৮৬৯ সালে । ওয়ার্ড ৯, মহল্লা ৫৬, মহল্লা ৩। আয়তন ১৯.৫৭ বর্গ কিঃমি। জনসংখ্যা ৭৭১৬৫; পুরুষ ৫২.৫১%, মহিলা ৪৭.৪৯%। জনসংখ্যা ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিঃমি ৩৯৪৩ জন। শিক্ষার হার ৫৯%।

প্রশাসনঃ

প্রসাশাসন ১৮৬০ সালে বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৮৪ সালে মহাকুমাটি কিশোরগঞ্জ জেলায় রুপান্তরিত হয়। পৌরসভা ৪, উপজেলা ১৩, ইউনিয়ন ১০৫, মৌজা ৯৪৬, গ্রাম ১৭৭৫। উপজেলা সমুহ: অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, ভৈরব, হোসেনপুর, ইটনা, করিমগঞ্জ, কটিয়াদি, কিশোরগঞ্জ সদর, কুলিয়ারচর, মিটামইন, নিকলী, পাকুন্দিয়া, তাড়াইল। পৌরসভাসমূহ: কিশোরগঞ্জ সদর, বাজিতপুর, ভৈরব, কুলিয়ারচর।

কিশোরগঞ্জের উপরদিয়ে প্রবাহিত উল্লেখযোগ্য নদীগুলোঃ
ব্রহ্মপুত্র, ধনু, নরসুন্দা, মেঘনা, সিংগুয়া, সুতী, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী, ঘোড়াউতরা, সোয়াইজানী।

জেলার নদী বন্দরঃ  ২টি,  ভৈরব ও চামটা ঘাট।

প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদঃ

জংগলবাড়ি দুর্গ (পঞ্চদশ শতক), এগার সিন্দুর দুর্গ (পঞ্চদশ শতক) সাদী মসজিদ (১৬৫২), সালংকা জামে মসজিদ (পাকুন্দিয়া), গুড়ই মসজিদ, বাজিতপুর (১৬৮০), কুতুবশাহ মসজিদ, অষ্টগ্রাম (১৫৩৮), জাওয়ার সাহেব বাড়ি মসজিদ, তাড়াইল (১৫৩৪), বাদশাহী মসজিদ, ইটনা (সপ্তদশ শতক), ভাগলপুর দেওয়ানবাড়ি মসজিদ, বাজিতপুর (অষ্টদশ শতক); সেকান্দারনগর মসজিদ, তাড়াইল ( অষ্টদশ শতক), কুড়িখাই, কটিয়াদি (১০০৫ হি.), চন্দ্রাবতী শিব মন্দির (ষোড়শ শতক), মঠখোলা কালীমন্দির, পাকুন্দিয়া (সপ্তদশ শতক), অধিকারীর মঠ, এগারসিন্দুর (ষোড়শ শতক), দিল্লীর আখড়া, মিটামইন (সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে নির্মিত)।

প্রাপ্ত শিলালিপি:

ঘাগড়া গ্রামে প্রাপ্ত আরবী শিলালিপি (সুলতান নাসিরউদ্দিন প্রথম মাহমুদ শাহর আমলে নির্মিত); নটরাজ শিবমুর্তি (চতুর্দশ শতক, নিকলীর শহর প্রাপ্ত), নন্দকিশোর প্রামাণিক দেয়া কৃষ্ণদাসের দলিল (১৭৫৯, কিশোরগঞ্জ)।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলীঃ

প্রাচীনকালে কিশোরগঞ্জ কামরুপ রাজ্যের অন্তভুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। এরপর অঞ্চল অথবা কিয়দংশ একাদশ ও দ্বাদশ শতকে পাল, বর্মণ ও সেন রাজাদের শাসনাধীনে থাকার পর কোচ, হাজং, গারো, রাজবংশী প্রভৃতি আদিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে এ অঞ্চলে জংগলবাড়িসহ কতিপয় স্বাধীন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। ১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজশাহের আমলে ময়মনসিংহ অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও কিশোরগঞ্জ এর বাইরেই থেকে যায়। তবে মুঘল সম্রাট আকবরের সময় কিশোরগঞ্জের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অন্তভূক্ত হলেও জংলবাড়ি ও এগারসিন্দুর কিছু এলাকা কোচ, অহম রাজাদের শাসনাধীনে থাকে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মুগল বাহিনীর হাতে এগারসিন্দুরের অহম রাজার পরাজয় এবং ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে ঈসা খানের হাতে জংগলবাড়ির কোচ প্রধানের পরাজয় হয় এবং কিশোরগঞ্জের ব্যপক অঞ্চলে ঈসা খানের একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে সর্বালোচিত ও তাৎপর্যপুর্ন ঘটনা হচ্ছে, এগারসিন্দুর নামক স্থানে বারভূঁইয়া প্রধান ঈসা খানের নিকট মুগল সেনাপতি মানসিংহের যুদ্ধ ও পরাজয়ের কাহিনী। ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ান ঈসা খানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুসা খাঁনের কিশোরগঞ্জ বিস্তির্ণ অঞ্চল স্বীয় শাসনাধীনে রাখলেও পরবর্তীকালে পরিপুর্নভাবে মুগল অধিকারে চলে আসে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নঃ

কড়ইতলা (বর্তমান শহীদনগর)স্মৃতিসৌধ, শহীদ খায়রূল জাহান বীর প্রতীক স্মরণে নির্মিতব্য স্মৃতিফলক, প্যারাভাঙ্ঘা।

ধর্মীয় প্রতিস্ঠানঃ মসজিদ ১০৩৫, মন্দির ১৩৮।

জনসংখ্যাঃ ২৫২৫২২১; পুরুষ ৫০.২৯%, মহিলা ৪৯.৭১%; মুসলিম ৯২.১০%, হিন্দু ৭.২০%,অন্যান্য ০.৭%।মোট জনসংখ্যার ০.২৩% আদিবাসী বা নিম্নবর্গীয় তফসিলি জনগোষ্ঠী।

স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঃ

গড় স্বাক্ষরতা ২১.৯৪%; পুরুষ ২৬.৯৪%, মহিলা ১৬.৪%।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঃ

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ১টি,নার্সিং কলেজ ১টি, বিশ্ববিদ্যালয় (প্রক্রিয়াধীন) ১টি,কলেজ ২৫টি,কলেজিয়েট হাই স্কুল ৪টি,মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০১টি,মাদ্রাসা ১২০টি, কারিগরী প্রশিক্ষন কেন্দ্র ২টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮০৮টি,বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১,১৩৭, কিন্ডারগার্টেন ১৬টি।সুখ্যাত প্রতিষ্ঠান কিশোরগঞ্জ বালক উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৮১), হাফেজ আবদুর রাজ্জাক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বাজিতপুর (১৮৯০), জংগলবাড়ি হাই স্কুল (১৮৬২), মংগলবাড়িয়া মাদ্রাসা (১৮৭২), হোসেনপুর হাই স্কুল (১৮৯০), আগরপুর গোকুলচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, কুলিয়ারচর (১৯০৭), কোদালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পাকুন্দিয়া (১৯১০), আচমিতা জর্জ ইন্সটিটিউট (১৯২০), বনগ্রাম বিদ্যালয় (১৯১২), আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৬)।

আঞ্চলিকভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীঃ

দৈনিক আজকের দেশ, গৃহকোণ, ভাটির দর্পণ, প্রাত্যহিক চিত্র । অবলুপ্ত: সাপ্তহিক: আর্য্যগৌরব (আনু: ১৯০৪), কিশোরগঞ্জ বার্তাবহ (১৯২৪), ‘আখতার’ উর্দু পত্রিকা (১৯২৬), কিশোরগঞ্জ বার্তা (১৯৪৬), প্রতিভা (১৯৫২), নতুন পত্র (১৯৬২), পাক্ষিক নরসুন্দা(১৯৮১), গ্রামবাংলা (১৯৮৫), সৃষ্টি (১৯৮৬), সকাল (১৯৮৮), সূচনা (১৯৯০), কিশোরগঞ্জ পরিক্রমা (১৯৯১), মনিহার (১৯৯১), কিশোরগঞ্জ প্রবাহ (১৯৯৩), ‘বিবরনী’ কুলিয়ারচর স্মারক সংখ্যা (১৯৯৩)।

জনগোষ্ঠির প্রধান পেশাসমূহঃ

কৃষি ৪৫.৪৮%,মাছ ধরা ১.৮৭%, কৃষি মজদুরি ২১.০২%, দিনমজুর ৩.২৯%, ব্যবসায় ১১.২%, যানবাহন ২.০৬%, চাকুরী ৪.৪৭%, অন্যান্য ১০.৬১%

জমির ব্যবহারঃ

মোট চাষ উপযোগী জমির পরিমান ১৮৭৯৭৫.৩১ হেক্টর,খাস জমি ১৯৫১৭.৬৭ হেক্টর। এক-ফসলী ৪৬.৭৪%, দ্বি-ফসলী ৩৯.৪৪%, ত্রিফসলী ১৩.৮২%; সেঁচের আওতাভুক্ত জমি ৫৯.০৬ হেক্টর।

কৃষকের মাঝে জমির নিয়ন্ত্রন ১৬.১৯% ভূমিহীন,১৩.৩৫% প্রান্তিক চাষী,২৯.৪২%ছোট, ১৮.৯৪% মাঝারী,২২.১০% বড় চাষী।

জমির মূল্যঃ প্রথম মানের ০.০১ হেক্টর জমির মূল্য প্রায় ১০০০০টাকা। প্রধান শস্য ধান,পাট,গম,আলু,মিষ্টী আলু,ডাল, বাদাম, ভুট্টা, আঁখ, সরিষা, মটরঁশুটি, শাকসব্জি। বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত শস্য তিল,তিসি,চিনা,কাউন,কালি বোরো ধান, জংলি ধান,পান। প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, কলা, বেল, লেবু, লটকন, তেঁতুল, চালতা, জলপাই, কামরাঙা, লিচু, জাম্বুরা, আমলকি, হরতকি, আঁতা।

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ পাঁকা রাস্তা ২৮০কিমি, আধাপাঁকা রাস্তা ২১০ কিমি, কাঁচা রাস্তা ৫০৪৩।৫০কিমি, রেলওয়ে ৫৭কিমি,রেলস্টেশন ১২টি, ফেরিঘাট (আন্তঃজেলা) ৮টি; জলপথ ৬০কিমি।

ঐতিহ্যবাহী যানবাহন পাল্কি,মহিষের গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, পানসি নৌকা, সরাংগা নৌকা। এই যানবাহনগুলো বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়।

শিল্পকারখানাঃ

কালিয়া চাপড়া চিনিকল (অকেজো); কিশোরগঞ্জ চিনিকল (অকেজো); যশোদল টেক্সটাইল মিলস, জেমিনি টেক্সটাইল মিলস্ (প্রা.) লি, বাদাম তৈল মিলস্ (অকেজো), আফতাব ফিড মিলস (প্রা.) লি, (রামদী-আগরপুর)।

কুটির শিল্পঃ

পনির, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদি, কাঠের তৈরী জিনিস, মিষ্টিদ্রব্য, মসলিন, ঝিনুকের মুক্তা, কাগজ মিল, হাতির দাঁতের তৈরি দ্রব্য, শীতলপাটি, শাঁখা ও দারুশিল্প উল্লেখযোগ্য।

হাট, বাজার,মেলাঃ

মোট হাট বাজার ১৪৯টি, তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হোসেনপুর,পুমদী,সরারচর, হিলচিয়া, করিমগঞ্জ,ইটনা,অষ্টগ্রাম,কুলিয়ারচর,আগরপুর,তারাইল, কালিয়াচাপড় উল্লেখযোগ্য।

উল্লেখযোগ্য মেলা: কুড়িখাই মেলা (কটিয়াদি); ঝুলন মেলা (বত্রিশ); কাইমার বাউলী মেলা (বাজিতপুর); কামালপুর মেলা (সরারচর); অষ্ট্বমী মেলা (হোসেনপুর, মঠখলা, তাড়াইল, ডুমরাকান্ধা); মহররমের মেলা (অষ্টগ্রাম), পোড়াবাড়িয়া মেলা (পাকুন্দিয়া); কান্দুলিয়ার মেলা (কুলিয়ারচর), নিকলী মেলা (নিকলী); গুড়ই মেলা (নিকলী); ভাগলপুর মেলা (বাজিতপুর)।

প্রধান রপ্তানীজাত পণ্য ধান, পাট, ডিম, দুধ, কলা, মুরগী, সব্জি, লিচু, সরিষা, বাদাম।

এন.জি.ও কার্যক্রমঃ কার্যত গরুত্বপূর্ন এন.জি.ও গুলো হচ্ছে ব্র্যাক, প্রশিকা, আশা, কেয়ার, পপি, ওআরএ, এসাপ, গ্লোবাল ভিলেজ ও গ্রামীণ ব্যাংক।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১টি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতাল ৬টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১৩টি, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১৭ টি, টিবি ক্লিনিক ১টি, মাতৃমংগল কেন্দ্র ৩টি, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৬১টি।

1 Response for “কিশোরগঞ্জ জেলা”

  1. Munna Haque বলেছেন:

    আমাদের কিশোরগঞ্জ বাসীর জন্য আনেক উপকারী হবে ।

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম