মূসা খাঁ

মূসা খাঁ মাজারবাংলার মুসলমানদের শাসন কালেই বার ভূঁইয়াদের উৎপত্তি ও প্রভাব বিস্তার হয়। তাহাদের পূর্ব পুরুষের প্রায়ই ছিলেন সামরিক জায়গীরের মালিক।

১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দে ১৭ ইং সেপ্টেম্বর তারিখে ঈশা খাঁ স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় গাজীপুর জেলায় কালিগঞ্জ থানার বক্তারপুর গ্রামে (বক্তারপুর দূর্গে তৎকালীন মহেশ্বরদী পরগণা) সমাহিত করার পর তার পুত্র মুসা খাঁ বাংলার সোনারগাঁও ও ভাটিঅঞ্চলের অধিপতি হন এবং তিনি এক বিশাল রাজ্যের উত্তোরাধিকারী হিসাবে বৃহত্তর ঢাকা ও কুমিলস্না জেলার প্রায় অর্ধেক, প্রায় সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা এবং রংপুর, বগুড়া, পাবনা জেলার কিয়াদংশ প্রাপ্ত হয়েন। তিনি পিতার মত মসনদ-ই-আলা উপাধি ধারণ করেছিলেন।

জন্মবৃত্তান্ত- ও ইতিহাসঃ

তিনি ১৫৬৬ সালে ২৩ শে মে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ঈশা খাঁ ও পিতামহ সোলায়মান খাঁ ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য
অঞ্চলের আফগান দলপতির বংশধর। তাঁর পিতা ও পিতামহ প্রখ্যাত সুফী সাধক ছিলেন। কোন কোন পুস্তকে উল্লেখ করা হইয়াছে পিতামহের নাম লাল মোহন রায়, আবার কোন কোন পুস্তকে  কালিদাস গজদানী রাজপুতের বংশধর উল্লেখ করা হইয়াছে। মুসলমান হওয়ার পর তাঁর নাম সোলায়মান নাম রাখা হয়। এই বর্ণনাগুলি আদৌ সত্য নহে বলে ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশন ও মুসা খাঁর বংশধরদের মতামত প্রকাশ।

ঈশা খাঁ এর মৃত্যুর পর মুসা খাঁ তার সোনারগাঁও জমিদারীতে সোনারগাঁওয়ের অদূরে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জনহল যে স্থানটিতে অবস্থিত সেই স্থানটিতে মুসা খাঁ প্রসাদ বাটি অসংখ্য দালান-কোটা নির্মাণ করেছিলেন এবং তারই পশ্চিম পার্শ্বে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এইটাকে বলা হইল “বাগ-ই-মুসা”। জনশ্রুতিতে আছে দক্ষিনে ঢাকা-বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী (লালবাগ এলাকা, সদরঘাট এলাকা, সমস্ত পুরাতন ঢাকা এলাকা, লর্ড কার্জন হল এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট এলাকা, রেসকোর্স ময়দান এলাকা) হইতে শাহবাগ এলাকা পর্যন্ত “বাগ-ই-মুসা” বিস্তৃত ছিল অর্থাৎ মুসা খাঁ এর নাম অনুসারে “বাগ-ই-মুসা” বলা হইত। এই স্থানটি মুসা খাঁ এর জমিদারীতে নিজস্ব জমি হিসাবে গণ্য হইত। মুসা খাঁ তার রাজধানী সোনারগাঁও হইতে ঢাকা অঞ্চলে স্থানান্তর করার মনস্ত করেন। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল যে স্থানটিতে অবস্থিত সেই স্থানটিতে মুসা খাঁ প্রসাদ বাটি অসংখ্য দালান-কোটা ছিল। ঐ স্থানে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালে ১৪ই ফেব্রুয়ারী পূর্ব বাংলা সরকারের সরকারী ভবন হিসাবে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

পরবর্তীতে ভবনের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে তাঁর কৃতিত্বের অংশ এবং স্মৃতি হিসেবে বিশাল এলাকার ভবনটির নামকরণ করা হয় কার্জন হল। বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনটি ১৯০৫ সালের অব্যবহিত পরে নির্মিত তৎকালীন সেই ভবন ব্রিটিশ সরকারের সচিবালয় ছিল। আর কার্জন হলটি ভাইসরয়ের বাসভবন কাম অফিস ঘর ছিল ১৯২১ সালের দিকে ঢাকা মেডিকেলের ভবনটি সম্প্রসারণ করা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই কার্জন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে (ঐতিহ্যের স্বরূপ সন্ধানে মোঃ সিরাজুল ইসলাম)। ১৯০৪ সালের পরে পূর্ব বাংলা সরকারে সরকারী ভবন তৈরীর সময় মুসা খাঁ তৈরী দালান-কোটাগুলি ধ্বংশ করা হয়। শুধুমাত্র মুসা খাঁ মসজিদটি ও মাজার টিকে থাকে (ঈশা খান-মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন শাহজাহান, পৃষ্ঠা নং-১৩৩)।

দক্ষিনে বর্তমান ঢাকা শহরের বুড়িগঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত ছিল। বৃহত্তর ঢাকা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সরকার সোনারগাঁওয়ের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ঈশা খাঁ সরকার বাজুহার ১৫টি, সরকার ঘোড়াঘাটে ১টি এবং সরকার সোনারগাঁওয়ের ৬টি সর্বমোট ২২টি পরগণার আধিপত্য গ্রহণ করেছিলেন (ময়মনসিংহের ইতিহাস কেদার নাথ মজুমদার)। মুসা খাঁ ১৬০৮ খ্রীষ্ঠাব্দে ভাটি অঞ্চলে শাসক হিসাবে থাকাকালীন সময়ে বাগ-ই-মুসা এলাকা তৎকালীন শহর হিসাবে পরিচিত ছিল। তিনি তার সভাসদ, কর্মচারীগণ অন্যান্য ভূঁইয়া ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়ে অত্যনত্ম আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে তারই নেতৃত্বে বাংলার ১৬০৮ সালে বাগ-ই-মুসা এলাকা অর্থাৎ ঢাকা এলাকা রাজধানী সোনারগাঁওয়ের পরিবর্তে ভাটি অঞ্চলের অর্থাৎ বাংলার রাজধানী স্থাপনের ঘোষনা দেন এবং মুসা খাঁ এর প্রাসাদ বাটি দালান-কোটা রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর পিতা ঈশা খাঁ সোনারগাঁও বাংলার রাজধানী স্থাপন করেছিলেন এবং মুসা খাঁ নিজে ঢাকায় অর্থাৎ বাগ-ই-মুসা এলাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন নিজ দায়িত্বে ঘোষণা দেন। (ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশন দ্বারা সংগৃহীত ও মুসা খাঁ এর বংশধরদের বর্ণনানুসারে) প্রায় দুইশত বৎসর স্বাধীন বাংলার রাজধানীরূপে সোনারগাঁর গৌরব ছিল অক্ষুন্ন।

ঢাকার নামকরনঃ

মুসা খাঁ ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজধানী সোনারগাঁও পরিত্যাক্ত করে ঢাকা ভাটি অঞ্চলের বা বাংলার রাজধানীরূপে গড়ে তুলেন। শেষ পর্যন্ত ডাকচেরা দখল করার পর ইসলাম খাঁ সেনাবাহিনী নিয়া ঢাকার দিকে অগ্রসর হন এবং উহা ১৬১১ সালে দখল কনে। তখন তিনি ঢাকার নাম পরিবর্তন করিয়া সম্রাট জাহাঙ্গীর নাম অনুসারে জাহাঙ্গীর নগর নামকরণ করে সংস্কার সাধন করেন। (বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হইতে সংগৃহীত)।

শহরটির নাম কে বা কারা রেখেছিল ঢাকা?  ঢাকা নাম প্রসঙ্গে কাহিনী ও কিংবদন্তী আছে। কিংবদন্তী আছে নাম প্রসঙ্গে, বিক্রমপুর রাজ্যের রাজা আদিসুরের নির্বাসিতা স্ত্রীর গর্ভে ব্রহ্মপুত্র সন্তান বল্লাল সেনের জন্ম হয়েছিল বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড়ে জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে। প্রকাশ যে রাজা আদিসুর তার গর্ভবর্তী রাণীকে প্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দিলে তিনি প্রাণ বিজর্সনের জন্য ব্রহ্মপুত্রে ঝাপ দেন। আর ব্রহ্মপুত্র তাকে নিরাপদে অপর তীরে নিয়ে দেবী দূর্গার হাতে তুলে দেয়। বুড়িগঙ্গার তীরে দূর্গাদেবীর আশ্রয়ই বল্লাল সেনের জন্ম ও লালন পালন। এই বলস্নাল সেন তার আশ্রয় দাত্রীর দূর্গাদেবীর প্রতিমুর্তি জঙ্গলে ঢাকা অবস্থায় প্রাপ্ত হন। এই দূর্গা প্রতিমুর্তি নিয়েই স্থাপিত হয়েছিল ঢাকেশ্বরী মন্দির। বলা হয় বলস্নাল সেনের জঙ্গলের ঢাকা পড়া দূর্গাদেবী বা ঢাকা ঈশ্বরী থেকে ঢাকেশ্বরী আর তার থেকে ঢাকা নামের উৎপত্তি।

অনেক কাহিনীতে আছে”ঢাকা” নামটি ঢাকবৃক্ষ থেকে । আবার অনেকের মতে ঢাক বৃক্ষ থেকে নয় অনেক জানা অজানা বৃক্ষের পত্রপুঞ্জের ছায়া ঢাকা পরিবেশ থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি। ঢাকা নাম প্রসঙ্গে, “ঢাকা” বৃক্ষ থেকে না ঢেকিশাক থেকে ঢাকা নামের উৎপত্তি সে কথা।মোঘল রাজধানী হওয়ার পরে মুসা খাঁ এর রাজধানী “ঢাকা” এর পরিবর্তে মোঘল সম্রাটের নাম অনুসারে “জাহাঙ্গীর নগর” নাম করা হয়। আইন-ই-আকবরীতে ঢাকার নামে সমগ্র পরগানাটিকে “ঢাকা বাজু” নামে উলেস্নখ করা হয়।

মুসা খাঁ এর শাসনঃ

সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বের প্রারম্ভে পূর্ব বঙ্গে মুসা খাঁই ছিলেন সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী শাসক। ১৬০২ সালে এক নৌযুদ্ধে রাজা মানসিংহ পরাস্ত করেন মুসা খাঁর বাহিনীকে। ১৬০৩ সালে পূর্ব বঙ্গের অন্যতম ভূঁইয়া কেদার রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর অধিকৃত স্থানগুলি এবং শ্রীপুর, বিক্রমপুরের দূর্গ মুসা খাঁ এর হস্তগত হয়। ১৬১১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলার অধিপতি ছিলেন। মুসা খাঁ এক শক্তিশালী নৌবাহিনীর অধিকারী ছিলেন। রাজধানী সোনারগাঁও ছাড়াও খিজিরপুর, কাত্রাবো, কদমরসুল, যাত্রাপুর, ডাকচর, শ্রীপুর ও বিক্রমপুর তার দূর্ভেদ্য সামরিক ঘাটি ছিল। অন্যান্য ভূঁইয়াদের সহায়তায় পূর্ববঙ্গে আধিপত্য অক্ষুন্ন রাখার জন্য তিনি এগার বৎসর কাল (১৫৯৯-১৬১১) মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।

মুসা খাঁ এর রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুলত ঢাকা জেলার এমক একটি স্থানে যেখানে গঙ্গা, পদ্মা, লখিয়া এবং ব্রহ্মপুত্রের মেঘনা সঙ্গমস্থলে। ফিজিরপুরে কাটরাবো নামক এবং বর্তমান ঢাকা কার্জন হল নামক স্থানে বাগ-ই-মুসা প্রাসাদবাটি নির্মাণ করে বসবাস করতেন। মুখা খাঁ এর রাজধানী ছিল সোনারগাঁ এবং পরবর্তীতে ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দে বর্তমানে ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী হইতে শাহবাগ এলাকা অর্থাৎ বাগ-ই-মুসা তে। মুসা খাঁ পিতার মতো তেজস্বী ও স্বাধীন চেতা ছিলেন। তিনি শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর দ্বারা স্বীয় রাজ্যের প্রভূত্ব অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করেন।

সমগ্র বাংলায় তখন মুঘল শাসনের বিরম্নদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছিল। বাংলার সামগ্রিক পরিস্থিতি যখন এই পর্যায়ে তখন সুবেদার ইসলাম খাঁ বিদ্রোহী জমিদারদের অন্যতম প্রধান নেতা মুসা খাঁ দূর্গ আক্রমণ করার জন্য মুঘল সেনাপতি ইফতেখার খাঁ এর অধীন এক হাজার অশ্বারোহী, তিন হাজার বন্দুকধারী এবং তার নিজস্ব বাহিনীসহ প্রায় সকল মুসনবদারকে প্রেরণ করেন। ইফতেখার খাঁ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মুসা খাঁর দূর্গের দিকে যাত্রা করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন যে, মুসা খাঁর দূর্গ আক্রমণ করা অসম্ভব। দূর্গের একদিকে নদী আর অপর তিন দিকে বিল দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এই সময় মুসা খাঁ তার নিজের অবস্থা সম্বন্ধে গভীর চিন্তাযুক্ত ছিলেন এবং বুঝতে পারেন যে, যুদ্ধে তার পক্ষে বিজয়ী হওয়া অসম্ভব। মুঘলরা জমিদারদের ঘাটিগুলো একের পর এক ক্রমান্বয়ে দখল করে যাচ্ছিল। যাত্রাপুরের পর তারা দখল করে নেয় ডাকচরা দূর্গ। যাত্রাপুরের দূর্গের রক্ত ইলিয়াস খাঁ মুঘল বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেন। যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসা খাঁ পুনরায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি শীতলক্ষা নদীকে প্রতিরড়্গার ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করেন। বিক্রমপুর ও শ্রীপুরে স্থাপন করেন ছোট ছোট চৌকি। বন্দর খালের তীরে তিনি নিজে অবস্থান করেন। মীর্জা মোমিনের ঘাটি ছিল তার পশ্চাদে এবং আল আওয়াল খাঁর ঘাটি ছিল খালের অপর তীরে। তিনি আব্দুলস্নাহ খাঁকে কদম রসুলে, দাউদ খাঁকে কাতরাবোতে, মাহমুদ খাঁকে ডেমরার কালে এবং বাহাদুর গাজীকে ছাওরায় নিযুক্ত করেন।

ইসলাম খাঁ মুঘল সেনাপতি মীর্জা নাথানকে পাঠান দাউদ খাঁ এর বিরুদ্ধে কাতরাবোতে, শেখ রুকুন উদ্দীন কে মাহমুদ খাঁর বিরুদ্ধে ডেমরা খালে, এবং আব্দুল ওয়াহিদকে পাঠানা বাহাদুর গাজীর বিরুদ্ধে ছাওরায়। মীর্জা নাথান সূর্যাস্তের আগেই কাওরাবুর বিপরীত দিকে অবস্থিত একটি স্থানে এক রাতের মধ্যেই একটা সুদৃঢ় কেল্লা গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি স্থাপন করেন বড় বড় কামান। এই যুদ্ধে দাউদ খাঁর বাহিনী পরাজিত হয়।

ইতিমধ্যে মুসা খাঁ এই অভিযান সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি তৎক্ষনাৎ প্রতিরোধের জন্য নৌবহর কাতরাবুর দিকে পাঠান। ভীষণ যুদ্ধ বেধে যায়। হাতাহাতি যুদ্ধের পর দাউদ খাঁর দূর্গের পতন ঘটে। এরপর মুঘল বাহিনী মুসা খাঁর দূর্গ আক্রমণ করেন। দূর্গের নিকট মুঘল বাহিনীর উপসি’তি টের পেয়ে মুসা খাঁ দূর্গ ত্যাগ করে নৌকাযোগে পালিয়ে যান। এদিকে মীর্জা মোমিন তার নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কতিপয় নির্বাচিত অশ্বারোহি নিয়ে বন্দর খাল পাড় হয়ে যান। খালের অপর তীরে মুসা খাঁ নৌবহর অবস্থান করছিল। মীর্জা মোমিনের সৈন্যদের দেখে আল-আওয়াল খাঁ তার দূর্গ ত্যাগ করে মুসা খাঁ নৌবহরের সহিত মিলিত হন। এই সংঘর্ষকালে বন্দরখাল জোয়ারের জলে পূর্ণছিল। সৈন্য এবং ঘোড়ার পড়্গে সে সময় খাল পার হওয়া ছিল কষ্টকর ব্যাপার। মুঘল বাহিনীর সৈন্যরা খাল পার হয়ে ওপারের দিকে যখন যাচ্ছিল, তখন মুসা খাঁর বাহিনীর তাদেরকে আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে বৈরামবেগ ও রুস্তমবেগ নামক দুইজন মুঘল সেনা মুসা খাঁ নৌসেনাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। যুদ্ধে বৈরামবেগ নিহত হন, আর রুস্তমবেগ আহত হন এবং অন্যান্য অনেকেই শোচনীয়ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মুসা খাঁ সোনারাগাঁও এর দিকে চলে যান এবং সেখানে অবস্থান গ্রহণ করেন।

বাহারি স্থান-ই-গায়েবী রচয়িতা মীর্জা নাথান নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সম্ভবতঃ তিনিই ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দে ১২ ই মার্চ প্রথম নৌ অভিযান পরিচালনা করেন। তুকমাক খাঁর পরিখা থেকে ইসলাম খাঁ ঢাকার দিকে যান। ইতিম খাঁ এবং মীর্জা নাথান আল আওয়াল খাঁর দূর্গে অবস্থান করেন। এবং সেখান থেকে সোনারগাঁও এর দিকে যাত্রা করে সোনারগাঁও দখল করেন।

মুসা খাঁ ইব্রাহীমপুরের দ্বীপে পালিয়ে যান। ইতিমধ্যে দাউদ খাঁ পর্তুগীজ জলদস্যুদের কর্তৃক নিহিত হন। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা শুনে মুসা খাঁ কিং কর্তব্য বিমুঢ় হয়ে পড়েন। প্রয়োজনীয় শোকানুষ্ঠানের পর ছোট বড় সকল জমিদারকে একত্রিত করে এক বিরাট অনিয়মিত বাহিনী নিয়ে তিনি মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। কয়েকদিনের মধ্যে তিনি কোদালিয়া ফাঁড়ি দখল করেন। এই যুদ্ধে মুঘল বাহিনী নিজেদের অবস্থাকে রক্ষা করার জন্য প্রাণপন প্রচেষ্টা চালায়। মুঘল গোলন্দাহ বাহিনীতে বড় বড় কামান থেকে মুসা খাঁ বাহিনীর উপর গোলাবর্ষণ করা হয়েছিল। শাহী ফৌজ তিন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। পূর্ববর্তী যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মুসা খাঁ মীর্জা নাথানের দূর্গের দিকে ধাবিত হয়। মীর্জা তার বন্দুকধারী সৈন্যদের হুকুম দেন নদীর তীর বন্ধ করে দিতে। বন্দুক থেকে শীলা বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করা হয়। মুসা খাঁর সৈন্যরা বিষের টুকরোর মতো সেগুলো হজম করে অদম্য সাহসের সঙ্গে কামানের গোলা ছুড়ে বন্দুকধারী সৈন্যদের হটিয়ে দেয়। এবং নদীর তীর ভূমি দখল করে। দুই দলে তুমুল লড়াই চলে। এই যুদ্ধে মীর্জা শাহবাজ খাঁ বায়িজের অধীন আড়াইশত আফগান সৈন্য মুঘল পক্ষে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে জমিদার বাহিনী কঠোর ধৈর্য্যের পরিচয় দেয়। মীর্জা নাথান তার বিরাট আকার হাতি নিয়ে এগিয়ে আসেন। তিনি এমন সময় সেখানে আসেন যখন জমিদার বাহিনীর আক্রমণে মুঘল বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পিছনে হটে যাচ্ছিল যুদ্ধে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তরবারী করাত পরিণত হয়। লৌহ শিরস্ত্রানের উপর তরবারীর আঘাতে আগুনের ফুলকি ঝরছিল। কামানের ধোয়ায় আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। অন্ধকারে পরিনত হয়ে উঠছিল উজ্জ্বল দিন। এই যুদ্ধে জমিদার বাহিনী অসীম সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়।

ইসলাম খাঁ শেষ পর্যন্ত ডাকচর দখল করার পর সেনাবাহিনী নিয়া ঢাকার দিকে অগ্রসর হন এবং ১৬১১ সালে দখল করে নেন। তিনি ইহার নাম পরিবর্তন করিয়া সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে রাখলেন “জাহাঙ্গীর নগর”। ঐ সময় মুসা খাঁ ও তাঁর মৈত্রীজোটে অংশগ্রহণকারী মুসলমান জরিদারগণ ইসলাম খাঁ এর নিকট আত্মসমর্পন করেন। এ প্রসঙ্গে সম-সাময়িক ঐতিহাসিক মীর্জা নাথান তাঁর বাহারিস্থান-ই-গায়বী গ্রন্থে বলেছেন যে, মুসা খাঁ শাহী বাহিনীর অসংখ্য বিজয় দেখে যুদ্ধের সমস্ত আশা ত্যাগ করেন। শাহী কর্মচারীদের সাথে আত্মসমর্পন করা ভিন্ন নিজের নিরাপত্তার আর কোন পথ দেখতে পাননি। ইসলাম খাঁ এর অনুমোদনক্রমে তিনি এবং মিত্র জমিদারদের নিয়ে ইসলাম খাঁ এর নিকট আত্মসমর্পন করেন। আত্মসমর্পন করার পর মুসা খাঁ ও তার পরিবারের সদস্যদেরকে ইসলাম খাঁ এর নির্দেশে বাগ-ই-মুসাতে নজরবন্দি করে রাখা হয়। বাহারি স্থানের গ্রন্থ হইতে আরও জানা যায় যে, এরপর সুবাদার ইসলাম খাঁ মুসা খাঁ এর সহিত সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফলে মুসা খাঁ এবং তাঁর মিত্র জমিদারগণ কুচবিহার, কামরূপ, আসাম ও ত্রিপুরায় মোঘল অভিযানে ইসলাম খাঁ কে সহযোগিতা করেন। পুরস্কার হিসেবে ইসলাম খাঁ তাঁর পরগনা সমূহ জায়গীর হিসেবে প্রদান করেন। মুসা খাঁর রাজধানী বাগ-ই-মুসা এলাকাতে ঢাকাকে রাজধানী ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দে ঘোষিত হওয়ার পর ইসলাম খাঁ ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দে ঐ ঢাকাকে জাহাঙ্গীর নগর নামকরণ করেন। মুসা খাঁ জাহাঙ্গীর নগর সুসজ্জিত ও সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য ইসলাম খাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন।

মূসা খাঁ এর অবদানঃ

মুসা খাঁ ছিলেন একজন প্রজা দরদী শাসক। তিনি একটি সুগঠিত প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । মুসা খাঁ এর মুখ্য মন্ত্রী ছিলেন হাজী শামসুদ্দীন বাগদাদী এবং একজন মন্ত্রী ছিলেন খাজা চাঁদ। সেনাপতি ছিলেন আবদাল খাঁ। নৌ-বাহিনীর প্রধান ছিলেন রামই লস্কর ও জানকী বল্লভ বলহাম।

শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসা খাঁ প্রভূত উন্নতি সাধিত করেছিলেন। বাংলার ভাষার মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে সাহিত্য রচনায় বিদ্যান ব্যক্তিদের তিনি উদার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। নাথুরেশ ছিলেন তাঁর দরবারের একজন পন্ডিত ব্যক্তি। নাথুরেশকে দিয়ে “শব্দরত্নকারী” নামে একটি সংস্কৃত অভিধান প্রণয়নে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

তাঁর সময়ে কৃষক সমাজে প্রভুত উম্মতি সাধিত হয়েছিল। খাদ্য দ্রব্যের মুল্য ছিল খুবই অল্প। ঐ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার লাভ করে।শহীদুল্লাহ হলের উত্তর পশ্চিম কোনে সদর রাস্তার লাগ পূর্বদিকে মুসা খাঁ মসজিদ অবস্থিত। একটি উচু প্লাট-ফরমের উপর নির্মিত। মসজিদের নিচের তলায় উক্ত প্লাট-ফরমে অতি প্রশস্ত দেওয়াল বিশিষ্ট কয়েকটি কড়্গ আছে। উপর তলে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদ। তবে অন্যান্য মসজিদের মত ইহা কারম্নকার্য নহে।  দক্ষিণ দিক দিয়ে মসজিদের উপরে উঠার সিঁড়ি পথ এটি ” মুসা খাঁ মসজিদ” নামে পরিচিত। এই মসজিদটি ১৬২৩ খ্রীষ্টাব্দে মুসা খাঁ নির্মান করেছিলেন। (বাংলা পিডিয়া হইতে সংগৃহীত) এ এইচ দানীর মত অনুসারে এটা মুসা খাঁ এর পুত্র ফিরোজ খাঁ এবং ফিরোজ খাঁ এর পুত্র মনোয়ার খাঁ তৈরী করেছিলেন। তাঁর পিতামহ মুসা খাঁ স্বরণে নামকরণ করেন। উক্ত মসজিদটি বর্তমানে জরাজীর্ন অবস্থায় আছে।

চিরনিদ্রাঃ

মুসা খাঁ ১৬২৪ খ্রীষ্টাব্দে ১৯ শে অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার বাগ-ই-মুসা অবস্থিত মুসা খাঁ মসজিদের সন্নিকটে তিনি সমাহিত আছেন। যাহা নিতান্ত অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ হল এবং কার্জন হল প্রাঙ্গনে অবস্থিত)।

সুত্রঃ ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশন

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম