মোহাম্মদ সাইদুর

মোহাম্মদ সাইদুর। তাঁর নামটি ছোট করে ‘মোঃ সাইদুর’ রেখেছেন তিনি নিজেই। তাঁর অনেক খেয়ালের এটি ও একটি। জন্মগ্রহন করেছেন ২৮ জানুয়ারি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নগাঁও নামক গ্রামে তার পৈত্রিক নিবাস।পিতার নাম মরহুম কুতুবউদ্দিন আহমদ।কিশোরগঞ্জ জেলার বর্তমান বিন্নগাঁও এলাকার বগাদিয়া নামক গ্রামে মোহাম্মদ সাইদুরের জন্ম হয়।

তবে তাঁদের মূল বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত ফুলপুর উপজেলার শনকান্দা গ্রামে। তাঁর প্রপিতামহ শনকান্দা গ্রাম থেকে চলে আসেন প্রথমে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার শাহেদল নামক গ্রামে।সেখান থেকে পূনরায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে আসেন বর্তমান বিন্নগাঁও এলাকার বগাদিয়া গ্রামে।তাঁর পরিবারের পূর্বপুরুষ পূর্বাপর কৃষিজীবী এবং পাট ব্যবসায়ী বেপারী ছিলেন।

পৈত্রিক পেশা কৃষি ও ব্যবসা থাকলে ও তাঁর পিতা সাংসারিক কাজকর্ম দেখতেন না। তাঁর মেজ চাচা যুক্ত ছিলেন পাট ব্যবসায়ে এবং কৃষিকাজ দেখাশুনায়।সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট দুই চাচা। সাইদুরেরা ছিলেন ৩ভাই, ১ বোন। মোঃ সাইদুর, মোঃ শাহজাহান, মোঃ দিলুয়ার হোসেন ও শামছুন্নাহার। পিতার মতোই সারাজীবন সংসার করলাম ঘর করলাম না- মন্ত্রে একনিষ্ট ছিলেন। পিতামহ আসমত আলী বেপারী থেকে বংশ পরম্পরায় লোক সংস্কৃতি চর্চার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয় তার পরিবারে। পিতা ছিলেন লোকগীতি রচয়িতা, সুরকার ও গায়ক-কবি। পুথিপাঠে ও তার দক্ষতা ছিল। সরকারি পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি বিভাগ ইত্যাদিতে গীতিকার হিসাবে চাকরী করতেন।

বিষয়ভিত্তিক গান বেঁধে তাতে সুর লাগিয়ে নিজেই গান গাইতেন।কৃষিভিত্তিক গান তিনি বহু রচনা করেছেন।পিতা পিতামহের এই ঐতিহ্যকেই পরবর্তিতে মোঃসাইদুর আশ্রয় করে নিজ গৃহে লোক ঐতিহ্যের আশ্রম ও সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সপ্ন তাঁর পূরন হয় নি।এর আগেই তিনি এই ইহধাম ছেড়ে, সংসার ছেড়ে সাহিত্যচর্চার সহযোগীদের ছেড়ে পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন।

মোঃ সাইদুরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারম্ভ বিন্নগাঁও প্রাইমারী স্কুলে।এরপর তিনি তমালতলা প্রাইমারী বিদ্যাপীঠ, কিশোরগঞ্জ মাইনর স্কুল(বর্তমান পিটিআই) এবং আজিম উদ্দিন হাই স্কুলে পরাশুনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর প্রবেশিকা পরীক্ষায় তাঁর বসা হয় নি।ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বাম্পন্থী রাজনীতির সুবাদে কিশোরগঞ্জ যুবলীগের সেক্রেটারীর পদ অলংকৃত করেন। তখন কমুনিষ্ট নেতা নগেন সরকার, অজয় রায়, রবি নিয়োগী(শেরপুর), আলতাফ আলী প্রমুখের সাথে তাঁর একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ সময় তিনি সাংবাদিকতা ও শুরু করেন।ঢাকা থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘পূর্বদেশ’ এর স্থানীয় সাংবাদিক পদে কাজ করেছেন। সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’ তেও তিনি কিছুকাল স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ‘কিশোরগঞ্জ বার্তা’র সম্পাদনার কাজ ও করেছেন তিনি। আবার ১৯৫৬ খ্রীস্টাব্দে ভাসানী আহুত কাগমারী সম্মেলনে জারী গানের দল নিয়ে সে অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। তিনি কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ছিলেন। তাঁর প্রথম লেখা ফিচার ‘পূন্যতীর্থ সীতাকুন্ডু’ শিরোনামে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায়।

তাঁর প্রথম রচিত প্রবন্ধ ‘দ্বিজ বংশীদাস’ প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায়। তাঁকে লোক সাহিত্য সংগ্রাহে আন্তরিক উৎসাহ দান করেছিলেন তখনকার গুরুদয়াল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুসাহিত্যিক নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ(নরেন ঘোষ), মোমেনশাহী গীতিকার সম্পাদক জনাব বদিউজ্জামান প্রমুখ। বাংলা একাডেমী থেকে লোক সাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োগের বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে প্রচারিত হলে তিনি উক্ত পদে দরখাস্ত করেন। যথারীতি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলা একাডেমিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপত্র নিয়ে লোকসাহিত্য সংগ্রহ একাডেমিতে জমা দেন।প্রথমে চার মাস ও পরে এক বছর অন্তর অন্তর পুনর্নিয়োগ দেয়া হত। এভাবে তার চাকরি এবং বাংলা একাডেমীতে কাজ করার সুত্রপাত ঘটে।অতঃপর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কেন্দ্রিয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের সাথে বাংলা একাডেমী একীভূত হলে তিনি স্থায়ীভাবে নিয়োগপত্র পান। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমীতে তাঁর একক লোক শিল্প সংগ্রহ প্রদর্শনী হয়।

১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারীতে ওপেন এয়ার প্রদর্শনীতে তাঁর নিজস্ব লোকশিল্প সংগ্রহের প্রদর্শনী হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের সাথে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত যৌথভাবে নকশীকাঁথা প্রদর্শনী করেন।এছাড়া এই শেকড়সন্ধানী তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফলস্বরুপ ভারত,জাপানসহ বিভিন্ন দেশে ও বিদেশে সংবর্ধিত এবং পুরষ্কৃত হয়েছেন।তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ এবং ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে কারুশিল্পী পরিষদ থেকে সম্মাননা। তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সাইদুর মোমেনশাহী গীতিকা ছাড়া ও বিভিন্ন পালাগান তথ্য সংগ্রাহক ছিলেন।

‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ নামক পালাগানটি নিকলী উপজেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এই সংগ্রহের জন্য মোঃ সাইদুরকে ভারতের কলকাতা শহরে সংবর্ধনা প্রদান করেন। সংবর্ধনা দিয়েছিলেন কলকাতা থিয়েটারের কর্ণধার বিভাস চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল শিশির মঞ্চে। মোঃ সাইদুর জাপানের ফুকুওয়াকা এশিয়ান আর্ত গ্যালারী ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে সম্মানসুচক ক্রেস্ট লাভ করেন।ইতিহাস সচেতনতা তাঁকে কিশোরগঞ্জের ইতিহাস রচনা ও সম্পাদনায় উদ্যোগী করেছেন। যৌথ সম্পাদনায় তিনি ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস’ রচনা করেছেন।

কিশোরগঞ্জের ইতিহাস রচনা কমিটির তিনি সাধারন সম্পাদক ছিলেন। মোঃ সাইদুরের নিজ বাসভবনে বগাদিয়ায় লোক ঐতিহ্য সংগ্রহশালা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেছিলেন প্রফেসর হেনরি গ্লাসি।মোঃ সাইদুর আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার।মোঃ সাইদুরের এই অপূর্ণতা আমাদের কিশোরগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্যকে আহত করে গেছে। মৃত্যু অবধি তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্য সংগ্রাহক ছিলেন।

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম