বিশ্বের বিষধর সাপ

অ্যান্টার্টিকা ছাড়া পৃথিবীর সবখানেই সাপের বসবাস। জলে-স্থলে। বিশেষ করে দ্বীপগুলো হলো এদের অভয়ারণ্য। পুরো পৃথিবীতে সাপের মোট ১৫টি পরিবার, সাড়ে ৪ শ’রও বেশি বর্গ এবং প্রায় ৩ হাজার প্রজাতি রয়েছে। ১০ সেন্টিমিটার থেকে শুরু করে ২৫ ফুট লম্বা সাপ দেখা যায়। তবে সম্প্রতি পাওয়া একটি সাপের ফসিল পাওয়া গেছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ ফুট, তার মানে আগে আরো লম্বা সাপের অস্তিত্ব ছিল। সাপ অন্যান্য সরীসৃপ থেকে ভিন্ন বিশেষ করে তার বিষের কারণে। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায় এবং আড়াই লাখ মানুষকে চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। পৃথিবীতে মোট ৬ শ প্রজাতি বিষধর সাপ রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু বিষধর সাপ রয়েছে যারা তাদের মরণকামড়ের জন্য আলোচনার শীর্ষে থাকে। অস্ট্রেলিয়ান ভেনম রিসার্চ ইউনিটের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১০টি বিষধর সাপের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।

১. স্থল তাইপেন (Inland Taipan)
পৃথিবীর বেশিরভাগ বিষধর সাপের আবাসভূমি অস্ট্রেলিয়া। স্থল তাইপেনের নিবাসও এই দেশে। বিষধর হিসাবে স্থল তাইপেন শীর্ষস্থানীয়। এ সাপ ক্ষুদ্র আঁশযুক্ত এবং হিংস্র সাপ হিসাবেও বেশ পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম : Oxyuranus microlepidotus। তাইপেন প্রজাতির এই সাপের এক ছোবলে সর্বোচ্চ ১শ ১০ মিলিগ্রাম বিষ নির্গত হয়। গোখরা সাপের বিষের চেয়েও এর বিষ ৫০ গুণ বেশি বিষাক্ত। এই সাপের কাটা একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্যক্তি ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে মারা যায়। এর গায়ের রঙ মৌসুমের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। সাধারণত হলুদাভ-বাদামি কিংবা বাদামির সাথে জলপাই রঙের মিশেল থাকে।

২. পূর্বাঞ্চলীয় বাদামি রঙের সাপ (Eastern Brown Snake)

এই সাপের বৈজ্ঞানিক নাম Pseudonaja textilis । অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চল এর আদিনিবাস। এর আরেক উপ-প্রজাতির বসবাস আবার নিউ গিনিতে। পূর্বাঞ্চলীয় বাদামি রঙের সাপের গায়ের রঙের ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত এর শরীর বাদামি বর্ণের হয়। তাছাড়া কালো, কমলা, হলুদ, ধূসর রঙেরও হয়। কম বয়সীদের মাথা কালো থাকে। এর বিষ মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস এবং শরীরের রক্ত জমাট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

৩. উপকূলীয় তাইপেন (Coastal Taipan)

এই সাপ লম্বায় ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের শরীরের রঙ কখনো ক্রিম-হলুদ, কখনোবা কমলা-বাদামি রঙের মিশেল হয়। অস্ট্রেলিয়ার কুইনল্যান্ডে এদের বেশি দেখা যায়। এদের দাঁত বেশ লম্বা ও তীক্ষ্ণ। এর বিষ সোজা গিয়ে মস্তিষ্কে আঘাত করে এবং মাংস পেশীর টিস্যুসমূহকে ধ্বংস করে দেয়। এর বিষ থেকে অনেক সময় বেঁচে গেলেও, রোগী কোমায় চলে যেতে পারে, কিডনিও নষ্ট হতে পারে। বৈজ্ঞানিক নাম, , Oxyuranus scutellatus ।

৪. টাইগার সাপ (Tiger Snake)

বৈজ্ঞানিক নাম Notechis scutatus । অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চল এই সাপের অভয়ারণ্য। এদের গায়ের রঙ একাধিক, কিন্তু গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ অবশ্যই থাকে। এরা লম্বায় ৭ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এই সাপ হিংস নয়, হঠাৎ করেই ছোবল দিয়ে বসে না, প্রথমে মুখ হাঁ করে সাবধান করে। এদের বিষ রক্ত ও মস্তিষ্ককে অকার্যকর করে এবং শরীর প্যারালাইজ্ড করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। নদী বা সমুদ্র উপকূলীয় বাসস্থান এদের পছন্দ।

৫. কালো টাইগার সাপ (Black Tiger Snake)

এলিপিডি পরিবারভুক্ত কালো টাইগারের বৈজ্ঞানিক নাম :Notechis ater। এরা দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে এদের বেশি পাওয়া যায়। নামে কালো হলেও এই সাপের গায়ের রঙ গাঢ় বাদামি, পেটের দিকটা উজ্জ্বল ধূসর থেকে কালচে বর্ণের। পাথুরে, শুষ্ক ও ঘাসে ছাওয়া জায়গা এদের পছন্দ। মাদি সাপ ২০ থেকে ৩০টি ডিম দেয়।

৬. চঞ্চু বিশিষ্ট সামুদ্রিক সাপ (Beaked sea snake)

সামুদ্রিক সাপের অন্যতম বিষধর প্রজাতির নাম চঞ্চু বিশিষ্ট সমুদ্রিক সাপ। চোখা নাকওয়াল এই সাপের বৈজ্ঞানিক নাম Enhydrina schistosa। এই নাকের কারণেই তাদের এমন নাম। প্রাপ্ত বয়ষ্ক চঞ্চু বিশিষ্ট সমুদ্রিক সাপের গায়ের রঙ হয় গাঢ় ধূসর। আরব সাগর, পারস্য উপসাগর, সিচেল, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউ গিনি নিয়ে এই সাপের এলাকা। সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই সাপ পানির ১শ মিটার নিচে যেতে সক্ষম এবং ৫ ঘণ্টা ডুব দিয়ে থাকতে পারে। এক কামড়ে একটি সাপ দেড় মিলিগ্রাম বিষ নির্গত করতে সক্ষম।

৭. চাপুল আইল্যান্ডের কালো টাইগার সাপ (Chappell Island Black tiger snake)

টাইগার সাপের অন্যতম প্রজাতি। বৈজ্ঞানিক নাম : Notechis serventyi । অন্যান্য কালো টাইগার সাপের মতোই এদের দেহের গঠন। শুধু এদের মাথাটা দেখতে থেতলানো মনে হয়। পুরো শরীর ৬ ফুটেরও বেশি লম্বা হয়। জলপাই-বাদামি বর্ণের মিশেল, অনেকটা কালো বলে ভ্রম হয়। পেটের দিকটা উজ্জ্বল রঙের। এই উপকূলীয় সাপ বেশ শান্তশিষ্ট ও সহজে বশে আসে না।

৮. ডেথ অ্যাডার (Death Adder)

এই সাপের শরীর ছোট ও চিকন, ১ মিটারের বেশি বড় হয় না । মাথাটা তীর আকৃতির। এরা গাছের আড়ালে শিকারের আশায় লুকিয়ে থাকে। বিরক্ত হলে কিংবা ভয় পেলে এরা পথচলতি মানুষদের আক্রমণ করে থাকে। দ্রুত গতির এই সাপ একটি শিকারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। উষ্ণ আবহাওয়া ও পরিবেশ এদের বেশি পছন্দ। গ্রীষ্মে ১০ থেকে ৩০টি ডিম দেয় মাদি ডেথ অ্যাডার। বৈজ্ঞানিক নাম : Acanthophis antarcticus।

৯. গোয়ার্ডার (Gwardar)

গোয়ার্ডারের আরেক নাম পশ্চিমা বাদামি রঙের সাপ। খুবই দুধর্ষ। সাধারণত একটি প্রাপ্ত বয়ষ্ক গোয়ার্ডারের গায়ের বর্ণ হয় বাদামি। জলপাই বর্ণও সাধারণ। পুরো অস্ট্রেলিয়া জুড়েই এদের বসবাস। একটি গোয়ার্ডার এক ছোবলে প্রায় ৩ মিলিগ্রাম বিষ ছাড়তে পারে। বৈজ্ঞানিক নাম, Pseudonaja nuchalis। এদের বিষও একই সাথে রক্ত ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

১০. দাগি বাদামি রঙের সাপ (Spotted Brown Snake)

অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসী এই সাপের বৈজ্ঞানিক নাম Pseudonaja affinis। স্থানীয় ভাবে দিউজাইৎ নামে পরিচিত এরা লম্বায় ২ মিটার পর্যন্ত হয়। গায়ের রঙ সাধারণত বাদামি রঙের, ধূসর ও সুবজও হতে পারে। গায়ে কালো কালো দাগ বা ছোপ থাকে বলেই এদের দাগি বাদামি রঙের সাপ বলা হয়। অক্টোবর ও নভেম্বর মাস এদের মিলনের মৌসুম, ফলে এই সময়টিতেই এরা হিংস্র থাকে, অন্যান্য সময় এরা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। এদের বিষও মস্তিষ্ক ও রক্তকে নিশানা বানায়।

লিখেছেন- সুদীপ্ত সালাম

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম