ভৈরব উপজেলা

ভৈরব কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত ব্যবসাকেন্দ্র। ভৈরব উপজেলার উত্তরে কুলিয়ারচর উপজেলা, পশ্চিমে নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলা, দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্চারামপুর উপজেলা এবং পুর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলা অবস্থিত। ভৈরবে ইউনিয়ন ৭টি, ৯টি ওয়ার্ড, ২৪টি মহল্লা, পৌরসভা ১টি, মৌজা ৩২টি, গ্রাম ৮৪টি। ব্রিটিশ আমল থেকে ভৈরব ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। ভৈরবকে তাই অনেক সময় ভৈরব বাজার বলেও অভিহিত করা হয়। ভৈরব পৌরসভার বর্তমান মেয়র হাজী মোঃ শাহিন। তবে ভৈরব পৌরসভার উন্নতির পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশী তিনি হচ্ছেন দুইবার নির্বাচিত সাবেক মেয়র এডভোকেট ফখরুল আলম আক্কাস ।

ভৈরব উপজেলার ইউনিয়ন হচ্ছেঃ ১. শিমুলকান্দি ২. শ্রীনগর ৩. আগানগর ৪. সাদেকপুর ৫. শিবপুর ৬. কালিকাপ্রাসাদ ৭ . গজারিয়া ভৈরব উপজেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রামগুলো হচ্ছে শম্ভূপুর, চন্ডিবের, কমলপুর, শিমুলকান্দি, কান্দিপাড়া , শ্রীনগর, রাজাকাটা, তুলাকান্দি, চাঁদপুর, রসুলপুর, সাদেকপুর, লুন্দিয়া, শিবপুর, কালিকাপ্রাসাদ, বাঘাইকান্দি, মেন্দিপুর, ছাতিয়ানতলা চর, জাফরনগর । ভৈরব উপজেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাজার হচ্ছেঃ ১. ভৈরববাজার ২. ভোলাবাজার (বিনিবাজার), শম্ভুপুর ৩. শিমুলকান্দি বাজার ৪. গজারিয়া বাজার ৫. এতিমখানা বাজার, ছনছাড়া ৬. কালিকাপ্রসাদ বাজার ভৈরব উপজেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান হচ্ছে ভৈরব সেতু, ভৈরব সেতু পার্ক, মেঘনা নদী রেলওয়ে সেতু।

আঠারো শতকের রেনেলের মানচিত্রে ভৈরবের কোন অস্তিত্ব ছিল না। মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পলিবিধৌত বদ্বীপ এককালে উলুখাগড়ার বন নামে পরিচিত ছিল। মুক্তাগাছার জমিদার ভৈরব রায় তার জমিদারী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন জেগে উঠা এই এলাকায় মানব বসতি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে জমিদারের নামানুসারেই এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ভৈরব বাজার। আবার এই রকম মতও আছে যে ভৈরব মানে ভয়ংকর সেই জন্য এই নামকরন করা হয়েছে। হিন্দু জমিদার ভৈরবের বিভিন্ন অংশের নাম হিন্দু সংস্কৃতির ধারায় রেখে দেন। ভৈরবপুর,শম্ভূপুর, জগন্নাথপুর, চণ্ডিবের, শিবপুর, কালীপুর,কালিকাপ্রসাদ, ইত্যাদি পাড়া/মহল্লার নামে হিন্দু সংস্কারের প্রভাব সুস্পষ্ট। ভৈরবের আদি নাম ছিল উলুকান্দি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধের সময় তৎকালীন ভৈরব বাজারে পাক বাহিনী ঘাটি গড়ে তুলে। যুদ্ধের শেষ সময়ের দিকে তারা ভৈরব রেলওয়ে সেতু বোমা মেরে ভেঙ্গে ফেলে। প্রথম মুসলমান ব্যবসায়ী হিসেবে যিনি ভৈরব রায়ের জমিদারীতে আসেন তিনি হলেন শ্রীযুক্ত হাজী শেখ নূর মোহাম্মদ মিয়া। তিনি একজন তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ও সফল ব্যবসায়ী হিসেবে অচিরেই ভৈরবে তার আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন এবং সেই ব্রিটিশ আমলে তিনি হাতিতে করে চলাফেরা করতেন। জমিদার ভৈরব রায় তার জমিদারী সুপরিচালনা করার জন্য ভৈরব বাজারে রাজকাচারী ভবন প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখন উপজেলা ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান শাসনামলে ভৈরবের অবিসংবাদিত কৃতি সন্তান হাজী শেখ নূর মোহাম্মদ মিয়ার নাতি প্রয়াত এম. এ. মান্নান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের সেক্রেটারী হিসেবে স্বাধীকার আন্দোলনে অবদান রাখেন। তিনি ভৈরবের হাজী আসমত কলেজ, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, ভৈরব গার্লস স্কুল সহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শিমুল কান্দির জমিদারের পুত্র রেবতি বর্মণ কলকাতাই পড়াশোনার জন্য গেলে সেখানে তিনি কমিউনিস্টের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেসময় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বোমা তৈরির সারঞ্জাম সহ ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তখন তাঁকে ৫ বছরের জেল দেওয়া হয়। জেলে থাকার সময় ব্রিটিশরা তাঁর শরীরে Mycobacterium leprae জীবাণু ঢুকিয়ে দিলে পরবর্তীতে তিনি leprosy রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি শিমুল কান্দি চলে আসেন। সেখানে তিনি কিছুকাল থাকার পর কলকাতাই চলে যান। ১৯৫৬ সালে ভৈরব পৌরসভা গঠিত হয়। এর আয়তন ১৫.৩১ বর্গ কি: মি: পৌরসভার নাগরিক ১,৩০৩৭৪, পুরুষ : ৫১.৯২% মহিলা ৪৮.০৮%। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কি: মি: এ ২৩১০ জন। শিক্ষার হার ৫৩.৭৫%। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অধীনে ১৯০৬ সালে ১৫ জুন ভৈরব থানা ঘোষিত হয়। ১৯৮৩ সালে ১৫ এপ্রিল মানউন্নত থানায় রূপান্তর করা হয়।

২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ভৈরবের মোট জনসংখ্যা ২,৪৬,৮২০ জন। পুরুষের সংখ্যা ১,২৭,৬২০ জন। আর নারীর সংখ্যা ১,১৯,২০০। পুরুষের অনুপাত মোট জনসংখ্যার ৫১% আর নারীর অনুপাত ৪৯%। সর্বমোট গৃহের সংখ্যা গ্রামে ২৮,৯৪২ টি এবং শহরে ১৭,৬৯২ টি। সর্বমোট জমির পরিমাণ ৩০,০৮০ একর। চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১৭,৬১৬ একর। সেচের আওতায় অন্তর্ভুক্ত জমির পরিমাণ ২০,৩০২ একর। [উৎস: আদমশুমারী ২০০১]

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভৈরব উপজেলায় আলিয়া মাদ্রাসা আছে ৩ টি যেখানে ৬৬ জন শিক্ষক ও ৬২৫ জন ছাত্র আছে। জুনিয়র হাই স্কুল ২ টি শিক্ষক ১৬ জন ও ৬১২ জন ছাত্র আছে। ফুরকানিয়া মাদ্রাসা ২৬১ টি যেখানে ২৬১ জন শিক্ষক ও ১০,০৪০ জন ছাত্র আছে। কলেজ আছে ৬ টি যেখানে ১৩৯ জন শিক্ষক ও ২,৬৪৭ জন ছাত্র আছে। ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট ১ টি যেখানে ২৭ জন শিক্ষক ও ৬১৮ জন ছাত্র আছে। চক্ষু প্রতিবন্ধী স্কুল আছে ১ টি যেখানে ৩ জন শিক্ষক ও ২৭ জন ছাত্র আছে। কওমি মাদ্রাসা আছে টি যেখানে শিক্ষক ৬৪ জন ও ছাত্র আছে ৩,১৬২ জন। প্রাইমারি স্কুল আছে ৯২ টি যেখানে শিক্ষক আছেন ৩৯২ জন ও ছাত্র আছে ৩৬,৬৬৩ জন। কিন্দার গার্ডেন আছে ২৬ টি যেখানে শিক্ষক আছেন ১৯৬ জন ও ছাত্র আছে ৩,১৯৫ জন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে ১ টি। নামকরা স্কুলগুলো হলো ভৈরব কে. বি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (প্রাক্তন ভৈরব উচ্চ বিদ্যালয়), কমলপুর হাজী জহির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, শম্ভুপুর টেকনিক্যাল হাই স্কুল এন্ড কলেজ, বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়, শিমুলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় ( স্থাপিত ১৯৭০) হাজী আফসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, শ্রীনগর উচ্চ বিদ্যালয়। সেরা কলেজ হাজী আসমত কলেজ ( স্থাপিত ১৯৪৭), রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজ ( স্থাপিত ১৯৮৬), জিল্লুর রহমান মহিলা কলেজ, শিমুল কান্দি কলেজ, রাজনগর কারিগরি কলেজ অন্যতম। এছাড়াও চন্ডিবের জোবায়দা ওয়াজির শিশু সদন [এতিমখানা ] হাজী আসমত আলী এতিম বালিকা শিশু পরিবার ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিস্তান আছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভৈরবে মোট ২০ একর জায়গায় গমের চাষ হয়ে ৬ মেট্রিক টন গম উৎপন্ন হয়। ১৪,২১৯ একর জায়গায় ধান চাষ হলে ২১,৪৭৮ মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হয়। ১,৬৬৬,০০০,০০০ টি ডিম উৎপন্ন হয়। ৩ মেট্রিক টন করে দুধ ও মিষ্টি উৎপন্ন হয়। এছাড়াও ভৈরবে ১,৪৮৪ একর জায়গায় পাট চাষ হয় যেখানে ১,০৮৫ মেট্রিক টন পাট উৎপন্ন হয়। ভৈরবে অধিকাংশ লোক ব্যবসায়ী। কিছু অংশ জমি চাষের সাথে জড়িত। ভাটি এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কিছু অংশ মৎস্য আহরনের সাথে জড়িত। একটা অংশ চাকরি করার ফলে ভৈরবের বাহিরে বাস করে। এখানকার প্রধান ফসল ধান। এছাড়া এখানে প্রচুর পরিমানে শীতকালীন সবজি উৎপন্ন্য হয়। এখানকার প্রধান অর্থকরি ফসল পাট। তাছাড়া একটা বড় অংশ প্রবাসে বাস করে, অধিকাংশই ইটালি প্রবাসী। ইটালি প্রবাসীদের মধ্যে শম্ভুপুর ও জগন্নাথপুর উল্লেখযোগ্য।

দেশের কয়েকটি পাইকারি কয়লা বিক্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ভৈরব একটি। ভারতের মেঘালয় থেকে সুনামগঞ্জের তাহেরপুরের টেকেরঘাট হয়ে নদীপথে ভৈরবে কয়লা আমদানি করা হয়। পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রটি মেঘনা নদীর পাড়ঘেঁষা ভৈরব পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায়। বর্তমানে এ কেন্দ্র থেকে বৃহত্তর সিলেট ছাড়া দেশের সব জায়গায় কয়লা সরবরাহ হয়ে থাকে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এ কেন্দ্রের বড় বাজার। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ইট পোড়ানোর মৌসুম। ইটভাটা ও রড তৈরির কারখানায় ভৈরব থেকে চলতি মৌসুমে গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার টন কয়লা যাচ্ছে। এ কেন্দ্রে কয়লার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

ভৈরবে উৎপাদিত জুতা আকর্ষণীয় ডিজাইন, তুলনামূলক কম দাম এবং গুণগত মানের কারণে সারা দেশে এখন বেশ জনপ্রিয়। ব্যবসায়ীদের কাছেও বাণিজ্যিকভাবে ভৈরবের জুতা ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এ শিল্পের ক্রমবর্ধমান প্রসার ঘটায় স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানেরও যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জুতা শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটেছে ভৈরবে। জুতা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুরান ঢাকার পরই ভৈরবের অবস্থান। ভৈরবে এ শিল্পের বিকাশের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক সংগ্রামের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতায় জুতা শিল্পের প্রসার ঘটতে শুরু করলে ১৯৩০ সালের দিকে ভৈরব উপজেলার শিমুল কান্দি, গজারিয়া, মানিকদি, কালিকাপ্রসাদসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু লোক জুতা তৈরির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ নেয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর এসব শ্রমিক দেশে ফিরে পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার অবাঙালিদের জুতা তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করে। তারা সেখান থেকে দক্ষতা অর্জন করে পরবর্তী সময়ে ভৈরবে নিজ গ্রামে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে জুতার কারখানা। তবে প্রকৃত অর্থে এখানে এ শিল্পের বিকাশ ঘটে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বর্তমানে ভৈরব পৌর এলাকা ও উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০টি গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় মিলিয়ে সাত হাজারেরও বেশি জুতা তৈরির কারখানা। ভৈরব পৌর এলাকার কমলপুর, জামালপুর, হাজী ফুল মিয়ার পাদুকা মার্কেট, মধ্যেরচর, চণ্ডীবেড়, কমলপুর বাসস্ট্যান্ড, সাদুতলাঘাট, শিমুলকান্দি, বাঁশবাড়ী, গজারিয়া, মানিকদি, কালিকাপ্রসাদসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কারখানা গড়ে উঠেছে। দুই থেকে আড়াই লাখ শ্রমিক ভৈরবের এ জুতা শিল্পে জড়িত। জুতার ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে দুই-তিন হাজার। সেখানেও কাজ করছে ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমিক।

ভৈরবের বিশাল এলাকাজুড়ে জলাভূমি। বর্ষাকালে এসব এলাকাবাসীর যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। শুধু তাই নয়_ মাছ ধরা, গরু-বাছুরের জন্য কচুরিপনা ও ঘাস সংগ্রহ এবং হাটবাজারে মালপত্র পরিবহনেও প্রতিটি পরিবারের দরকার হয় নৌকা। ফলে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভৈরবে নৌকা তৈরির ধুম পড়ে যায়। পেশাজীবী নৌকার মাঝি ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে এক শ্রেণীর লোক নৌকা কিনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে লোকজন পাড়াপাড় করে নৌকার মাঝি হিসেবে বাড়তি উপার্জন করে থাকে। বর্তমানে এ এলাকায় কোষা নৌকার কদর বেশি। কড়ই, শিমুল ও চাম্বল কাঠের নৌকাই বেশি চলে এখানে।

নামকরণঃ মেঘনা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থলে অষ্টাদশ শতাব্দীতে জেগে উঠা বালুরচর বর্তমানে জনপদ ভৈরব। চরাঞ্চল ও জলাভূমিতে উলু-খাগড়ারর বন জন্মানোর কারণে স্থানটির প্রথম নাম হয় উলুকান্দি। এলাকাটি ভাগলপুর দেওয়ানদের জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবীনগর উপজেলা বিটঘরের দেওয়ান ভৈরব চন্দ্র রায় ভাগলপুরের জমিদার দেওয়ান সৈয়দ আহমদ রেজা এর কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে উলুকান্দি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতি শুরু করেন। জনবসতির পাশাপাশি একটি বাজার গড়ে উঠে। দেওয়ান ভৈরব চন্দ্র রায় তাঁর মা’র নামে বাজারটির নাম দেন কমলগঞ্জ প্রকাশ্যে ভৈরব বাজার।

প্রধান নদী সমূহঃ মেঘনা,পুরনো ব্রম্মপুত্র(প্রায় মৃত)।

ভৈরব শহরঃ
ভৈরব শহরটি মেঘনা নদির তীরে অবস্থিত। শহরটি পৌরশহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালে। এই পৌরসভার আয়তন ১৫.৩১বর্গ কিমি এবং লোকসংখা ৯১৯১৩;পুরুষ ৫১.৯২%,মহিলা ৪৮.০৮%।এ শহরে ১২টি ওয়ার্ড এবং ২৪টি মহল্লা আছে।শহরের স্বাক্ষরতার হার ৩৯.৭%।এ শহরে ৫টি ডাকবাংলো আছে।

উল্লেখ্যযোগ্য স্থান বা স্থাপনাঃ
১. ভৈরব রেল সেতু (শহীদ আব্দুল হালিম রেলওয়ে সেতু)
২. বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সেতু (সৈয়দ নজরুল ইসলাম সড়ক সেতু)
৩. দুর্জয়, ভৈরব (দুর্জয় স্মৃতি ভাস্কর্য)
৪. পানাউল্লার চরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য (পানাউল্লারচর বধ্য ভূমিতে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য)
প্রশাসনঃ

ভৈরব থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬সালে এবং উপজেলায় পরিনত হয় ১৯৮৩ সালে। এতে ১টি পৌরসভা, ৬টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪১টি মৌজা, ৭৯টি গ্রাম আছে।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলীঃ

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এই উপজেলার হালগারাতে পাক আর্মিরা ৩০০ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। খ্রীষ্টান ০.02%,বৌদ্ধ ০.০১% এবং

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিঃ স্মৃতি ভাস্কর্য ‘দুর্জয় ভৈরব’

ধর্মীয় প্রতিস্ঠানঃ মসজিদ ২০৮টি, মন্দির ১৩টি, গীর্জা ৭টি।

জনসংখ্যাঃ ১৯২৪৪৮; পরুষ ৫১.১১%, মহিলা ৪৮.৮৯%; মুসলিম ৯৫.১৮%, হিন্দু ৪.৭১%,খ্রীষ্টান ০.০২%, বৌদ্ধ ০.০১% এবং অন্যান্য ০.০৮%।

স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঃ

গড় স্বাক্ষরতা ২২.১%; পুরুষ ২৭.৮%, মহিলা১৬.৪%

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঃ

কলেজ ৫টি, উচ্চ বিদ্যালয় ১৫টি, জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয় ২টি, মাদ্রাসা ৬টি,সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫৮টি,বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৭টি। কারিগরী প্রশিক্ষন কেন্দ্র ১টি, সমাজ কল্যাণ প্রশিক্ষন কেন্দ্র ২টি।

উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে জগন্নাথপুর পুরাতন প্রাথমিক বিদ্যালয়(১৮৯৫), হাজী আসমত কলেজ(১৯৪৭), কে. বি. উচ্চ বিদ্যালয়। আঞ্চলিকভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো হল সাপ্তাহিক মোফাসসালচিত্র এবং সাপ্তাহিক নিরপেক্ষ অরুনিমা।

সাংস্কৃতিক সংগঠনঃ
পাবলিক লাইব্রেরী ৬টি, থিয়েটার গ্রুপ ৪টি, নাটক মঞ্চ ১টি,নারী সংগঠন ৩টি,সিনেমা হল ৩টি, সেচ্ছাসেবী সঙ্ঘঠন ৬৫টি,শিক্ষা সঙ্ঘ ৩টি।

প্রধান পেশাসমূহঃ
কৃষি ৩১.৩৭%,মাছ ধরা ২.৭৩%,কৃষি মজদুরি ৯.৬৮%,দিনমজুর ৫.১৩%,শিল্প প্রতিষ্ঠান ১.৯৮%,ব্যবসায় ১৯.৫২%, ফেরিওয়ালা ২.১৯%, যানবাহন ৪.০৩%, স্থাপনা ১.৩৮%, চাকুরী ৯.০১%, অন্যান্য১২.৯৮%

জমির ব্যবহারঃ
মোট চাষ উপযোগী জমির পরিমান ৯৫৯০.৮৬ হেক্টর,পতিত জমি ৬০হেক্টর, এক-ফসলী ৫৬.৫৪%,দ্বি-ফসলী ৩৯.৩৬%, ত্রিফসলী ৪.১০%; সেঁচের আওতাভুক্ত জমি ৪০১৯.৮৩ হেক্টর।

কৃষকের মাঝে জমির বন্টন ১২.১৬% ভূমিহীন,৫১.২৭%ছোট, ৩০.৩৭% প্রান্তিক, ৫.১৯%মাঝারী, ১.০১%ধনী চাষী।

জমির মূল্যঃ প্রথম মানের ০.০১ হেক্টর জমির মূল্য প্রায় ১০০০০টাকা। প্রধান শস্য ধান,সরিষা বীজ, ডাল, আলু, তিল, চিনাবাদাম, মরিচ, ধনিয়া। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় শস্য পাট, কার্পাস। প্রধান ফল আম, কলা, কাল জামা, পেয়ারা।

মাছ চাষ,পশুপালন,পোল্ট্রিঃ মাছের খামার ৪টি,পশু খামার ৩৮টি,পোল্ট্রি ৭৭টি, হ্যাচারী ১টি।

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ পাঁকা রাস্তা ৫০কিমি,আধাপাঁকা ১কিমি, মাটির রাস্তা ৫৫কিমি; রেলওয়ে ১৩.১১কিমি; জলপথ ১৭ নর্টিকাল মাইল। ঐতিহ্যবাহী যানবাহন পাল্কি(বিলুপ্ত),পাল তোলা নৌকা।

শিল্পকারখানাঃ জুট মিল ১টি,স’মিল ১০, লোহার(তারকাটা) কারখানা ২টি, ওয়েল্ডিং ৩৭টি।

কুটির শিল্পঃ স্বর্ণকার ৪২টি,কামার ৪০টি, কুমোর ৭টি।

হাট, বাজার,মেলাঃ মোট হাট বাজার ১৩টি,তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভৈরব, শিমুলকান্দী, গজারিয়া, চকবাজার;মেলা ৪টি, উল্লেখযোগ্য ফকির বাড়ি মেলা, সিদ্দীক বাজার মেলা।

প্রধান রপ্তানীজাত পণ্য মাছ, কয়েল, লোহা, জুতা, বিড়ি, বিস্কিট, লুঙ্গি, গামছা।

এন.জি.ও কার্যক্রমঃকার্যত গরুত্তপূর্ন এন.জি.ও গুলো হচ্ছে কেয়ার,ব্র্যাক,প্রশিকা,আশা,নীড,গ্লোবাল ভিলেজ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১টি, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ২টি, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৫টি, রেলওয়ে হাসপাতাল ১টি।

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম