সক্রেটিস

দর্শন শাস্ত্রের মহান পুরুষ সক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৯ অব্দে গ্রিসে জন্মগ্রহণ করেন। মা ফেনআরেট ছিলেন ধাত্রী, পিতা সফরে নিকাশ ছিলেন স্থপতি। পিতা-মাতা দুইজনে দুই পেশায় নিযুক্ত থাকলেও সংসারে অভাব-অনটন গেলেই থাকত। তাই ছেলেবেলায় পড়াশোনার পরিবর্তে পাথরকাটার কাজ করত। কিন্তু অদম্য জ্ঞানস্পৃহা সক্রেটিসের যখন সেখানে যতটুকু সুযোগ হতো সেখান থেকে জ্ঞান সঞ্চয় করতেন। প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন। খালি পা, গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনোদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোনো দোকানে, মন্দিরের চাতালে কিংবা বন্ধুর বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, নিজে এমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না, লোকদের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন। আসলে প্রশ্ন করা, তর্ক করা ছিল সে যুগের একশ্রেণীর লোকের ব্যবসা। এদের বলা হতো সোকিস্ট। এরা অর্থের বিনিময়ে লোকদের শিক্ষা ও বড় বড় কথা বলতেন। যারা নিজেদের পাণ্ডিত্যের অহংকার করতেন, বীরত্বের বড়াই করতেন, তিনি সরাসরি তাদের জিজ্ঞাসা করতেন বীরত্ব বলতে তারা কি বোঝে? পাণ্ডিত্যের স্বরূপ কি? তারা যখন কোনো কিছুর উত্তর দিত, তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। মূলতঃ তার দর্শন পদ্ধতি ছিল অবরোহ থেকে আরোহ পদ্ধতির দর্শন শিক্ষা যাকে দার্শনিকরা আস্তি-নাস্তিমূলক পদ্ধতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সক্রেটিসের জ্ঞানথিপি ও মায়ার্ত নামে দুই স্ত্রী ছিল। দুই স্ত্রীর গর্ভে তার তিনটি সন্তান জন্মলাভ করেছিল। দারিদ্র্যের মধ্যে হলেও তিনি তাদের ভরণ-পোষণের ও শিক্ষার ব্যাপারে কোনো উদাসীনতা দেখাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শিক্ষার মধ্যেই মানুষের অন্তরে জ্ঞানের পূর্ণ জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মধ্যদিয়েই মানুষ একমাত্র সত্যকে চিনতে পারে। যখন তার কাছে সত্যের স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সে আর কোনো পাপ করে না। অজ্ঞানতা থেকেই সব পাপের জন্ম। তিনি চাইতেন মানুষের মনের অজ্ঞানতাকে দূর করে তার মধ্যে বিচার-বুদ্ধিবোধকে জাগ্রত করতে। তিনি যুবকদের সুপথে পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা দিতেন।

তার বিখ্যাত উক্তি ছিল, Know theyself অর্থাৎ নিজেকে জানো। ডেলফির উপাসনালয়ে একবার জিজ্ঞাসা করা হয় সক্রেটিস অপেক্ষা বিজ্ঞতর কোনো ব্যক্তি আছেন কিনা। এর উত্তর আসে সক্রেটিস অপেক্ষা বিজ্ঞতর কোনো ব্যক্তি নেই। এই দৈববাণীতে তিনি সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। কারণ তিনি জানতেন, তিনি কিছুই জানেন না। সক্রেটিসের আদর্শকে দেশের বেশকিছু মানুষ সুনজরে দেখেনি। তারা সক্রেটিসের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে দেশের নাগরিক আদালতে সক্রেটিসের ঘোর বিরোধী অভিযোগ আনয়ন করেন। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনি এথেন্সের প্রচলিত দেবতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নতুন দেবতাদের প্রবর্তন করতে চাইছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি দেশের যুব সমাজকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেন। তৃতীয়ত, তিনি প্রচলিত গণতন্ত্র ও ত্রিশজন স্বৈরশাসকের বিরোধিতা করেছেন।

তাছাড়া আরো যেসব অভিযোগের উপর ভিত্তি করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় তা হলো :

সক্রেটিস অশুভ কাজ করেন, তিনি একজন কৌতূহলী ব্যক্তি, তিনি স্বর্গমর্ত্যের বিদ্যমান বস্তু নিয়েও অনুসন্ধান করেন এবং যা ভালো তাকে খারাপ বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন এবং অন্যকে এসব বিষয় শিক্ষা দেন।

এই অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তিনি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যা বলেছিলেন তা এ্যাপোলজি সংলাপে বর্ণিত আছে।

তিনি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন

‘হে আমার দোষ সাব্যস্তকারীগণ, আমি মৃত্যুকালে ব্যাকুল চিত্তে তোমাদের নিকট ভবিষ্যদ্ববাণী করে যাচ্ছি। তোমরা আমাকে সে শাস্তি দিলে আমার মৃত্যুর পর তা অপেক্ষা গুরুতর শাস্তি তোমাদের অবশ্যই ভোগ করতে হবে। আমি চলে যাচ্ছি, তোমরা রয়ে যাচ্ছো তিনিই ভালো জানেন, কে দোষী আর কে নির্দোষ।’

তারপর সক্রেটিস হেমলেক নামক বিষের পাত্র হাতে তুলে নিয়ে অকম্পিতভাবে শেষবারের মতো ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন এবং সমস্ত বিষ পান করলেন। তার মৃত্যুর পরই এথেন্সের মানুষ ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়ল। চারদিকে ধিক্কার ধ্বনি উঠল। বিচারকরা একঘরে হয়ে পড়ল। অনেককে জুতা পিটিয়ে মারা হলো, কেউ কেউ আত্মহত্যা করল। সক্রেটিসের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে তার নশ্বর দেহের শেষ হলেও চিন্তার শেষ হয়নি। তার> শিষ্য প্লেটো, প্লোটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলের মধ্যদিয়ে সেই চিন্তার এক নতুন জগৎ সৃষ্টি হলো, যা মানুষকে উত্তেজিত করছে আজকের পৃথিবীতে।

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম