সরারচরেও রয়েছে প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন!

মায়ারাণীর মঠ

সরারচর একটি প্রাচীন জনপদ যার পূর্বনাম ছিলো ফতেপুর। ভৌগলিক দিক বিবেচনায় এই জনপদ নৌ, সড়ক, রেল ও হাওড়াঞ্চলের নিকটবর্তী হওয়ায় এখনে দ্রুত বানিজ্যের প্রসার ঘটে। এখানকার প্রাচীন জীবন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষন করলে কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন চোখে পড়বে এর মধ্যে প্রাচীন বাড়ী, শান বাধানো পুকর ঘাট, মন্দির, মসজিদ, মাঝার অন্যতম যা বিশ্লেষন করলে সহজেই বুঝা যায়, ততকালীন কিছু শৌখিন মানুষের ধর্মের প্রতি অগাত বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং তাদের সচ্চল জীবন বিন্যাস।

আমার পর্যবেক্ষনে সরারচরের সর্বাধিক প্রাচীন স্থাপনা সম্ভবত মায়ারানীর মঠ। যা উত্তর সরারচর শিব মন্দিরের সন্নিকটে অবস্থিত। আমি ৫৫ বছর বয়সের নুরু মিয়া নামের  একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এর নির্মান ইতিহাস তিনি জানেন কিনা: 

প্রসঙ্গ টেনে আমাকে তিনি জানালেন –

আমার বাবা – দাদার আমলে এটি নির্মিত হয়নি, দাদা বলেছিলেন তিনিও ছোটবেলা থেকে এটি দেখে এসেছেন। শুধু তারা এই টুকু বলেছেন বর্তমান এই স্থানটিতে একসময় বাসস্থান ছিলো। আর ছোটবেলা থেকে এই মঠটির নাম তারা মায়ারানীর মঠ ও পাশাপাশি দূরত্বের খালের পাশের একটি তিনকোনা পুকুরকে মায়ারানীর পুষ্করীনি বলে জেনে এসেছেন।

রাম নারায়ন সাহার মঠ

সরারচরে যে কয়টি প্রাচীন স্থাপনা পাওয়া যায় তার মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল সনাতন ধর্মালম্বীদের । যারা ছিলো অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল, পেশায় ব্যবসায়ী। তেমনি একটি জোড়ামঠ রয়েছে সরারচর শিবনাথ স্কুলের ছাত্রাবাসের পাশে এর আনুমানিক বয়স সম্ভবত ১৪০ -১৬০ বছর । এই মঠটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহে যতদুর জানা গেছে – কটিয়াদির বাসিন্দা শিবনাথ সাহা এসে যখন এখানে স্কুল স্থাপনের ইচ্ছায় জায়গা ক্রয়ের প্রস্তাব করিলেন তখন এই জায়গার উত্তাধিকারীগন মঠের জায়গা বাদ দিয়ে স্কুলের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। আর এই জোড়া মঠটি ছিলো প্রয়াত ডাঃ তারক বাবুর পিতা ও মাতামহ শ্রী রাম নারায়ন সাহা ও পত্নী দূর্গা রানী সাহার। উল্লেখ্য মুক্তিযোদ্ধের অনেক স্বাক্ষ্য ধারন করে আছে নিপুন কারুকার্য খচিত এই মঠটি যা আজ অযত্নে অবহেলায় প্রায় ধংসের পথে।

শিবনাথ স্কুলের নিকটবর্তী পশ্চিমে ও সরারচর রেলগেইটের দক্ষিন পূর্বকোনের কোন একটি স্থানে একটি প্রাচীন মঠ ছিলো যা বছর দশের পূর্বে প্রকাশ্যেই বিনা বাধায় ভেংগে ফেলা হয়।সরারচর বাল্লা – কামালপুর প্রাইমারী স্কুলের পূর্বে ও সরারচর এয়ারপোর্টের পশ্চিমে আফতাব হেচারীর সংলগ্ন রামচন্দ্র সাহা ও তার পত্নীর জোড়া মঠ হয়েছে যা সিরামিক ও নিপূন কারু শৈলীতে পরিপূর্ণ। 

রাম বাবুর মঠ

এই জোড়া মঠটি সরারচরের অন্যান্য মঠগুলো থেকে সম্ভ্যাব্য নবীন কিন্তু কারু কার্যে দৃষ্টি নন্দন। ইতিমধ্যে এই মঠের কিছু গুরুত্বপূর্ন ধাতব অংশ গুলো ইতি মধ্যে চুরি হয়ে গেছে এবং দিন দিন এর স্থাপত্য শৈলী বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমার মতে এই মঠটি বর্তমানে সরারচরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় মঠ, যা এখন হুমকীর সম্মুখীন । তাছাড়া সরারচরের কামালপুর, মজলিশপুর, নিলোখী, গোবিন্দপুর মৌজায় বেশ কিছু প্রাচীন ধংস হয়ে যাওয়া স্থাপনা রয়েছে যার উপর পরিপূর্ন গবেষনায় উঠে আসবে আমাদের এই এলাকার প্রাচীন ইতিহাস।

আমাদের নিজস্ব অস্থিত্ব, ইতিহাস, সৃষ্টি কালের গহবরে হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে, তারপরও আমরা যা করেছি, যা দেখেছি, যা জেনেছি তা কেনইবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবো না কেনইবা তাদের বঞ্চিত করবো তাদের প্রাপ্য ইতিহাস থেকে । আমাদের এই নিদর্শন গুলোর সুষ্ঠু সুন্দর উপস্থান, রক্ষনাবেক্ষন আমাদের চারন ভূমি সরারচরকে ভিন্ন মর্যাদা এনে দিতে পারে সেই সাথে বদলে দেবে আমাদের জ্ঞান ও রুচীবোধ কে । অতপরঃ আসুন আমরা আমাদের প্রয়োজনে সচেতন হই এই সকল স্থাপনা নিদর্শন সংরক্ষনে নিজেরাই উদ্যোগী হই।

লিখেছেনঃ জি, এম ফ্রেজার

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম