বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২০১৫
স্বাধীনতার ঘোষণা: কিশোরগঞ্জের স্মৃতি

“This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.”


৭ই মার্চ ভাষন

১৯৭১ সালের মার্চে পুরো বাংলাদেশের মতো কিশোরগঞ্জেও আমরা উত্তেজনার সঙ্গে দিন কাটাচ্ছি। প্রতিদিন মিছিল-মিটিং-সমাবেশ। অনেক রাত পর্যন্ত আমার চেম্বারে আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুস সাত্তার উকিল (এমপিএ), মোস্তাফিজুর রহমান খান চুন্নু মিয়া (এমপিএ), বোরহান মোক্তারসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পরামর্শ করি। আমি তখন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এবং কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পঞ্চাশের দশকে আমরা কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করি, তাতে বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সম্পৃক্ততা ছিল। বর্তমান স্পিকার আবদুল হামিদ তখন তরুণ ছাত্র নেতা। কুলিয়ারচর ও ময়মনসিংহের ছাত্র জীবনে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন ও সামপ্রতায়িকতা প্রতিরোধের সংগ্রামকালে আমার সঙ্গে তৎকালে ময়মনসিংহে অধ্যাপনারত সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিচয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নকালে আমি যখন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে যোগ দেই এবং ঢাকা মেডিক্যাল চত্ত্বরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে অংশ নিয়ে কারাবরণ করি, তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় ও ঘণিষ্ঠতা। যার সূত্র ধরে কিশোরগঞ্জে চিকিৎসা পেশা শুরুর সময়ই আমরা সমমনারা মিলে আওয়ামী লীগ গঠন করি। মফস্বল শহর কিশোরগঞ্জে তখন সরকারি দফতরের বাইরে চিকিৎসক হিসাবে একমাত্র আমার বাসা কাম চেম্বারে টেলিফোন ছিল। এই টেলিফোন বার্তা কিশোরগঞ্জের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সশস্ত্র প্রতিরোধে গৌবরময় ভূমিকা পালন করে।

২৫ মার্চ তীব্র উত্তেজনা ও নানা ধরনের গুজব ও উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা অনুভব করছিলাম যে, পাকিস্তানিদের সঙ্গে আর নয়। ভোটের রায় আমাদের পক্ষে গেলেও অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক শোষণের মতো তারা রাজনৈতিক শোষণও অব্যাহত রাখবে। আমার বাসা তখন কিশোরগঞ্জের অলিখিত আওয়ামী লীগ অফিস নামে খ্যাত। যথারীতি অনেক নেতা-কর্মী ২৫ মার্চেও সমবেত হলেন। মধ্য রাত পর্যন্ত রইলেন সাত্তার উকিল, চুন্নু মোক্তার ও বোরহান মোক্তার। আমার একটি থ্রি ব্যান্ড মারফি রেডিও ছিল। কিছুদিন আগেই আমি একটি টেলিভিশন ও রেডিওটি আনি। শহরে তখন আর কারও টেলিভিশন নেই। থ্রি ব্যান্ড রেডিও ছিল বিরল। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করার পর মধ্য রাত পর্যন্ত চেষ্টা করি দেশি-বিদেশি বেতারে কিছু শোনার জন্য। কিন্তু কিভাবে জানবো যে, ঢাকায় তখন ইতিহাসের নির্মম গণহত্যা শুরু হয়েছে।

রাত ১ টার দিকে সকলে চলে গেলে আমি বিছানায় গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট শব্দে টেলিফোন বেজে উঠলো। সাধারণত এত রাতে কখনো ফোন বাজে না। আমি কিছুটা চিন্তিত হলাম। আমার কম্পাউন্ডারও শব্দ পেয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে বলে উঠলো: ‘ডাক্তার সাহেব বলছেন?’ আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলাম। উত্তর এলো: ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। আপনি সেটা প্রচারের ব্যবস্থা করুন।’ উত্তেজনায় বিশেষ কিছু ভাবার সময় পেলাম না। আমি জানি যে, কিশোরগঞ্জের একমাত্র আমারই ফোন নম্বর কেন্দ্রে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দলীয় বহু নির্দেশ আমার টেলিফোনের মাধ্যমে এসেছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু যতবারই কিশোরগঞ্জে এসেছেন, আমার বাসায় উঠেছেন। ফলে এরকম একটি খবর আমার জন্য আকস্মিক ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আমি বিশেষ সতর্ক হলাম এবং ফোনে কথা বলতে বলতেই চুন্নু মোক্তার এবং আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মহিউদ্দিন আহমদকে আনার জন্য আমার পাশে দাঁড়ানো কম্পাউন্ডারকে পাঠিয়ে দিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে ছুটতে ছুটতে তারা চলে এলেন। আমি মহিউদ্দিন আহমদের পরিচয় দিয়ে বললাম: ‘সেক্রেটারি সাহেব এসেছেন। কথা বলুন।’ আমাদের সামনে কম্পিত হাতে মহিউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাটি লিপিবদ্ধ করলেন।

চুন্নু মোক্তার ও মহিউদ্দিন আহমদকে ডেকে আনার সময় আমার কম্পাউন্ডার পথিমধ্যে অনেককেই ফোনে স্বাধীনতার বিষয়টি জানিয়েছে। আমার বাসাটা হলো কিশোরগঞ্জের গুলিস্তানখ্যাত গৌরাঙ্গ বাজারে। আশে-পাশে সব সময়ই কিছু লোক সমাগত থাকেই। আমরা ফোন রাখতে না রাখতেই দেখি বাসার সামনে লোকে লোকারণ্য। আমি আমার দোতলার বারান্দা থেকে চুন্নু মোক্তার ও মহিউদ্দিন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে পুরো বিষয়টি প্রচার করি। ছাত্রনেতারা ছুটে এসে আমার বাসায় একটি মাইক লাগিয়ে আমাকে পুরো ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করতে এবং স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার করতে অনুরোধ করে। মানুষ তখন স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনও কথাই শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা জনগণের আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতিফলন। আমি পুরো বিষয়টি জনতার উদ্দেশ্যে জানালাম। চুন্নু মোক্তার ও মহিউদ্দিন আহমেদও বক্তব্য দিলেন। শহরে আরও কয়েকটি মাইক বের হয়ে যায় ঘোষণাটি জানানোর উদ্দেশ্যে। রাতের মধ্যে জেগে ওঠে পুরো কিশোরগঞ্জ স্বাধীনতার সুতীব্র উত্তেজনায়। প্রায় সব আওয়ামী লীগের নেতা চলে আসায় অতিদ্রুত বৈঠক করে পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ইতিহাসের কি মহান ইঙ্গিত! ডিসেম্বরে সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম মুক্তাঞ্চল থেকে কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করি এবং যে বাসায় স্বাধীনতার ঘোষণা এসে পৌঁছেছিল, সেখানেই শতাধিক নেতৃস্থানীয় পাকিস্তানপন্থীকে (পৌরসভার চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল খান, এডভোকেট নূরুজ্জামান, মাওলানা আশরাফ আলী বৌলাই, অধ্যাপক মাহতাব উদ্দীন, আল-বদর কমান্ডার কেএম আমীনুল হক) বিনা রক্তপাতে আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করে সরকারি স্কুলে মিত্র বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাই এবং সেখানে মিত্র বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা ও আত্মসমর্পনকারীসহ শত শত মুক্তিপাগল জনতার উল্লাসধ্বনির মধ্যে শহরে উপস্থিত একমাত্র সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে স্বাধীন কিশোরগঞ্জে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। সে আরেক ঐতিহাসিক অধ্যায়।

লিখেছেনঃ
ডা. মাজহারুল হক, কিশোরগঞ্জ

আপনাকে কমেন্টস করতে হলে অবশ্যই লগইন করতে হবে লগইন

বিষয় ভিত্তিক পোষ্টগুলো

কারিগরি সহায়তায়:

বিজ্ঞাপন

প্রবেশ - কপিরাইটঃ ২০০৭ থেকে ২০১৪ | কিশোরগঞ্জ ডট কম