সম্প্রতি বিশ্বকাপের সবচে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে রেফারিং বিতর্ক। রেফারিদের খেলা পরিচালনায় ভুল হচ্ছে হরহামেশাই। তাই দাবি উঠেছে প্রযুক্তি ব্যবহারের। কিন্তু ফিফা কিছুতেই এতে রাজি নয়। গোল লাইন বিতর্কে সবচে বেশি রসদ জুগিয়েছিলো ইংল্যান্ড বনাম জার্মানির ম্যাচটিতে ল্যাম্পার্ডের একটি জোরালো শট গোল বার অতিক্রম করলে। গোলের বাঁশি রেফারি বাজালেন না। কারণ তিনি বুঝতেই পারেননি। কিন্তু ভিডিও বা গোল লাইন টেকনোলজির আশ্রয় নিলে এ বিভ্রাট থেকে মুক্তি পাওয়া যেতো এমনই মন্তব্য করেছেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ফুটবল বিশ্বে এখন ক্রিকেট এবং টেনিসের মতো তৃতীয় আম্পায়ার এমনকি প্রযুক্তির শরণাপন্ন হবার জন্য বলছেন বিশিষ্টজনেরা। প্রযুক্তি এবং ফুটবলের মধ্যে মেলবন্ধন হবে কি না সেটিই জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের কথায় সায় দিয়েছেন বিভিন্ন বল-ট্র্যাকিং সিস্টেম নির্মাতা এবং বিভিন্ন দলের ফুটবল ম্যানেজাররাও।ক
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমি ক্রিকেট এবং টেনিসের ভক্ত। এসব খেলায় তৃতীয় আম্পায়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন ফুটবলেও এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে’।
সমস্যা হলো, বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বরাবরই এ পদ্ধতির বিপক্ষে।
হক-আই এবং কায়রোস এর মতো বল ট্র্যাকিং সিস্টেমের নির্মাতাদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচে ইংল্যান্ডের না দেয়া গোলটি এ সমস্যাটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে। এখন ফিফার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ।
কায়রোস এর কর্মকর্তা ক্রিশ্চিয়ান হোলজার জানিয়েছেন, আমরা খেলায় যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছি সেগুলো শতকরা ১০০ ভাগই নির্ভুল এবং খেলায় পরিচ্ছন্নতা এনে দিয়েছে।
https://i2.wp.com/tech.bdnews24.com/images/imgAll/fifa0407a.jpg?w=1080
অন্যদিকে ফিফার বক্তব্য, আমরা খেলার মধ্যে প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ চাই না। কারণ ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)এর বেশিরভাগ সদস্যই খেলার মধ্যে প্রযুক্তি আনার বিপক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।
কিন্তু সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ফিফার বক্তব্যের সঙ্গে আবার সব সদস্যরা একমত নন। বিভিন্ন খেলোয়াড়, ম্যানেজার, কোচ অনেক বছর ধরেই রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর বিপক্ষে প্রযুক্তির সাহায্য নেবার কথা বলেছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্যামেরা ডিটেকশন সিস্টেম প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান হক-আই এবং বলের মধ্যে চিপ প্রযুক্তি সরবারহকারি জার্মান ফার্ম কায়রো জানিয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে রেফারিদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
হোলজার জানিয়েছেন, ইংল্যান্ড দলের জন্য গোল না দেবার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিলো না। খেলার বিরতির আগে স্কোর যদি দুই-দুই হয়ে যেতো তবে হয়তো শেষ পর্যন্ত ফল অন্যরকমও হতে পারতো। উল্লেখ্য, ওই খেলায় জার্মানি শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলে জয়লাভ করেছিলো।
জানা গেছে, গোল লাইন টেকনোলজি (জিএলটি) এর বিষয়টি ফিফার দরবারে প্রায় ১ দশক ধরে ঝুলে আছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)
ফুটবলের যাবতীয় আইন-কানুন আইএফএবি সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুসারে নির্ধারিত হয়। আইএফএবি-এর ভোটিং ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য সংখ্যা ৮ জন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের একটি করে ভোটার সদস্য আছেন এবং বাকি ৪ জন সারা বিশ্বের ফিফার নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত হন।
ওয়েলসের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং আইরিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনসহ ফিফার অন্যান্য নির্বাহী সদস্যরা সবাই গোল লাইন টেকনোলজির বিপক্ষে।
ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ডেভিড ডেভিস-এর বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ) কয়েক বছর ধরেই ফিফাকে জিএলটি পদ্ধতি গ্রহণ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছে। কিন্তু, জানা গেছে, একমাত্র ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি সবাই এ ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ।

টেনিস-ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলেই বেশি দরকার
হোর্হে ল্যারিওন্দা, রবার্তো রসেত্তি, দুজনই এখন রেফারি থেকে খলনায়ক হয়ে গেছেন। ইংল্যান্ডের ফ্রাংক ল্যাম্পার্ডকে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করেছেন উরুগুয়ের রেফারি ল্যারিওন্দা। আর কার্লোস তেভেজের অফসাইড থেকে দেওয়া গোল ইতালিয়ান রেফারি রসেত্তির নজর এড়িয়ে গেছে। তাই ফুটবলের বিশ্বসংস্থা ফিফাও এখন রেফারি নিয়ে মহা বিপাকে।
তবে রেফারির সিদ্ধান্তে লাভবান-ক্ষতিগ্রস্ত উভয় পক্ষই এখন গোললাইন টেকনোলজি ব্যবহারের পক্ষে কথা বলছেন। এমনকি ফুটবলের বাইরের তারকাদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব আসছে প্রযুক্তির ব্যবহারের।
https://i2.wp.com/tech.bdnews24.com/images/imgAll/fifa0407b.jpg?w=1080
টেনিস তারকা রজার ফেদেরার টেনিসে ব্যবহৃত ‘হক আই’ প্রযুক্তি ফুটবলেও ব্যবহারের পক্ষে। তিনি বলেন, ‘টেনিসে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। যদিও টেনিসে এর খুব বেশি দরকার নেই। কিন্তু ফুটবলে দরকার।’ তিনি আরো জানিয়েছেন, ‘একটি গোল ম্যাচের ভাগ্যই বদলে দিতে পারে বলে ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহারটা আরো বেশি দরকার, ‘৯০ মিনিটের খেলা ফুটবলে গোল অনেক বড় একটা ব্যাপার। একটি গোলই পারে যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিতে’।

হক-আই : ক্যামেরানির্ভর প্রযুক্তি
অন্যদিকে ক্রিকেট বা টেনিস খেলার বেলায় হক-আই বা এ ধরনের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। হক-আই হলো- বলকে ট্র্যাক করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্যামেরার ব্যবহার। এ পদ্ধতিটি এখন ক্রিকেট এবং টেনিসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ক্রিকেট খেলায় হক-আই প্রযুক্তি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিলো ২০০১ সালে পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে টেস্ট খেলার সময়। এ প্রযুক্তি এখন ক্রিকেটে লেগ বিফোর উইকেট (এলবিডব্লিও) আউট দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে টেনিসের বেলায় হক-আই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিলো কিছুটা বির্তর্কিত ভাবেই। ২০০৪ সালে ইউএস ওপেন টেনিসে সেরেনা উইলিয়ামস আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে হেরে গেলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা নিয়ে কথা ওঠে। ২০০৬ সালেই হক-আই চলে আসে টেনিসেও।
ফুটবলে হক-আই প্রযুক্তিতে গোলবারের চারদিকে ৬টি ক্যামেরা বসানো থাকে। এসব ক্যামেরা গোল শনাক্তকরণের জন্য প্রোগ্রামও করা থাকে। এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘অবজেক্ট অফ ইন্টারেস্ট’। বল গোললাইন অতিক্রম করলেই সঠিকভাবে এ পদ্ধতিতে ধরা পড়ে । এবং সঙ্গে সঙ্গেই রেফারির কাছে থাকা রেডিওতে ‘বিপ’ সাউন্ড জানিয়ে দেয়। এতে রেফারির কাছে সংকেত পৌঁছাতে স্রেফ আধা সেকেন্ড সময় লাগে।
অন্যদিকে জিএলটি পদ্ধতি বিষয়ে ফিফার মন্তব্য, এ পদ্ধতি একেবারেই নির্ভুল নয়। আর এটি খুব বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। সবচেয়ে বড়ো কথা, এটির ফলে ফুটবলের বিশ্বজনীন আবেদন নষ্ট হয়ে যাবে।
এদিকে হক-আই সিস্টেমের উদ্ভাবক পল হকিন্স জানিয়েছেন, এটি ঠিকভাবেই কাজ করে তাই এটি ব্যবহার করলে খেলা আরো সুন্দর হবে। আর খরচের বিষয়টি দেখলে, টেনিসের বিষয়টি দেখতে হবে । টেনিসে রোলেক্স-এর মতো কোম্পানি আছে যারা এসব পদ্ধতি স্পন্সর করে। আর ফুটবলে এটি করা অসম্ভব কিছু নয়’।

কায়রোস জিএলটি : চৌম্বক ক্ষেত্রনির্ভর প্রযুক্তি
অন্যদিকে কায়রোস-এর গোল লাইন টেকনোলজি পদ্ধতিটি কিছুটা আলাদা। এতে ক্যামেরার পরিবর্তে বলেই ব্যবহার করা হয় বেশ কিছু ডিভাইস।
সরু কয়েকটি তার পেনাল্টি এলাকার সীমানা এবং গোল লাইন বরাবর লাগানো থাকে। এগুলো ক্ষুদ্র ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে। বলের মধ্যে থাকা ডিভাইস এসব ম্যাগনেটিক ফিল্ড এলাকা শনাক্ত করতে পারে। এবং এ এলাকার মধ্যে বল গেলেই বলের অবস্থান সম্পর্কে ডেটা পাঠাতে থাকে। এ ডেটা একজোড়া এন্টেনার সাহায্যে গ্রহণ করা হয়। গোল লাইন অতিক্রম করলেই রেফারির কাছে একটি সংকেত চলে যাবে। এবং সে সংকেত থেকেই রেফারি গোলের বাঁশি বাজাতে পারবেন। জানা গেছে, বলের মধ্যে চিপ থাকলেও বল খেলতে কোনো অসুবিধা হয় না। এ বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য অসংখ্য ম্যাচও খেলা হয়েছে চিপ ব্যবহার করা বল দিয়ে।
কায়রোস-এর বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এ ডিভাইসটির ওজন ১৫ গ্রাম। উল্লেখ্য, এবছর বিশ্বকাপ হচ্ছে জাবুলানি বল ব্যবহার করে। এ বলের ওজন ৪২০-৪৪৫ গ্রাম। হোলজার জানিয়েছেন, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ডকাপ ২০০৭ সাল থেকে কায়রোস-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

বেকায়দায় সেপ ব্লাটার
ফুটবল জগতের সবচে ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি। ফিফা প্রেসিডেন্ট বলে তাঁর সিদ্ধান্তই মাথা পেতে নেয় বিশ্বের সব ফুটবল ফেডারেশনই। কিন্তু সেই সেপ ব্লাটারই এখন ক্ষমা চাইছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার সামনে একটা পথই খেলা ছিলো, দুটি দেশের ফেডারেশনে ফোন করার। ফোন করেছি এবং তাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছি।
তবে তার আগে ব্লাটার বলছেন, ‘বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত রেফারিরা যেসব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে, গোল লাইন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা না করাটা বোকামিই হবে।

ফিফার অবস্থান
গোললাইন বিতর্কে ফিফার মন্তব্য ছিলো, রেফারির মাঠের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কথা বলবে না তারা। পর্তুগালের কোচ কার্লোস কুইরোজও বিতর্কমুক্ত ফুটবলের পক্ষে। এ জন্য তিনিও চাইছেন গোললাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের, ‘রেফারিদের সেদিনের সিদ্ধান্ত সম্ভবত বিশ্বের সবাই দেখেছে। আমাদের ফুটবল আরো এগিয়ে নিতে হবে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার ফুটবলেও হওয়া উচিত।’
https://i1.wp.com/tech.bdnews24.com/images/imgAll/fifa0407d.jpg?w=1080
ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়নও প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে। সম্প্রতি জানা গেছে, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে রেফারিদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্যার্থে প্রযুক্তির ব্যবহার বিবেচনা করতে অবশেষে রাজি হয়েছে ফিফা। এছাড়াও ফিফা রেফারিদের স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্তগুলোর জন্য সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছে।
প্রথমবার ফিফা জিএলটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো। তারা দাবি করে, তাদের ব্যবহৃত পন্থা একশত ভাগ সঠিক। এছাড়াও খেলাধূলায় প্রযুক্তির ব্যবহার ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলেও বিবিসিকে জানায় ফিফার এক মুখপাত্র। তবে এবার চাপে পড়েই সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছে ফিফা। ফিফার প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার বলেছেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে খেলায় প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা ভেবে দেখছি।’ তার মতে, ‘কিছু একটা পরিবর্তন আনা দরকার’।
তবে বাস্তবতা হলো, ফুটবলের জগতে গোল নির্ধারণে প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটবে কিনা সেটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ২০১১ সাল পর্যন্ত। কারণ ওই বছরই ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড এর পরবর্তী সম্মেলন হবার কথা। আর সেখানেই হয়তো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।