প্রায় ছয় বছর আগে নাটোরের একজন বৃক্ষপ্রেমীর বাগানে এই গাছটি প্রথম দেখা যায়। গাছের গায়ে নামফলকে লেখা ছিল ‘জামান ফল’। তাৎক্ষণিকভাবে মনে করার চেষ্টা করলাম, আমাদের দেশে এই নামে কোনো ফল আছে কি না। মনে পড়ে না। তবে মনে করা হয়, জামান নামের কোনো ব্যক্তি প্রথম এই ফলটি চাষ করেন বলেই এমন নামকরণ।

এ বছর কার্তিকের শেষ দিকে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে গিয়েছিলাম হেমন্তের ফলগুলো দেখতে। আমরা যখন বাগানে হেঁটে হেঁটে জলপাই, আমলকী, সফেদা দেখছি তখন সাংবাদিক ফজলুর রহমানের অনুসন্ধানী চোখ গাছতলা থেকে খুঁজে বের করল আধখাওয়া একটি ফল। দেখে বললাম, হয়তো কোনো বারোমাসি জাতের আম। আজকাল জিনপ্রযুক্তির কল্যাণে প্রায় সারা বছরই আম ফলতে দেখা যায়। কিন্তু ভুল ভাঙল ওপরের দিকে তাকিয়ে। এ তো আমগাছ নয়, একেবারে অচেনা একটি ফল। কয়েকটি থোকায় ঝুলে আছে গাছে। বাগানের ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা শামসুল আলম জানালেন এটি সেই জামান ফল। পোশাকি নাম এগফ্রুট। ইংরেজি নাম Canistel. তবে বৈশিষ্ট্যগত কারণে সারা পৃথিবীতে এদের অনেক নাম; ‘হলুদ সফেদা’, ‘মধু সফেদা’ ইত্যাদি। এই বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে চার-পাঁচটি গাছ পাওয়া গেল।

জার্মপ্লাজম সেন্টারের স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক এম এ রহিম ১৯৯৯ সালের দিকে থাইল্যান্ড থেকে এ গাছের কয়েকটি বীজ নিয়ে আসেন। তারপর ২০০১ সালে নিয়ে আসেন কয়েকটি কলম। কয়েক বছর ধরে বীজ এবং কলমের গাছ থেকে ফল ধরতে শুরু করেছে। তবে তুলনামূলকভাবে চারার গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া
যাচ্ছে।

এগফ্রুট (Pouteria campechiana) দক্ষিণ আমেরিকার চিরসবুজ গাছ। আদিআবাস মেক্সিকো। বর্তমানে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, তাইওয়ানসহ দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। গাছ ১০ মিটারের মতো বড় হতে পারে। পাতা দেখতে অনেকটা আমপাতার মতোই। ফুল সবুজাভ সাদা। ফল নানা গড়নের হলেও ডিম্বাকার ও আগা সুচালো ফলই সহজলভ্য। পরিপক্ব রঙ মলিন বা সোনালি হলুদ। ভেতরের শাঁসও কমলা হলুদ রঙের। স্বাদ অনেকটা সফেদার মতোই নরম, সুগন্ধি, খেতে কখনো মণ্ডের মতো, আবার কখনো সিদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো। শরবত করে লেবু মিশিয়েও খাওয়া যায়। ভেতরে চকলেট রঙের একটি আঁটি থাকে। ফলে রয়েছে ক্যালরি, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেড, ক্যালসিয়ামসহ আরও অনেক খাদ্যগুণ।

পিলিপাইনে এ ফলের নাম ‘ছেসা’, শ্রীলঙ্কায় ‘লাউলু’ বা ‘লাভুলু’, থাইল্যান্ডে ‘লামুট’ বা ‘খামুন’ নামে পরিচিত। স্প্যানিশদের আমলে ফিলিপাইনে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু খাবার উপযোগিতা ছাড়া ছায়াবৃক্ষ হিসেবেও এ গাছ আদৃত।

– লিখেছেন:মোকারম হোসেন