রাতভর অনিদ্রা কাটিয়ে শেষ ভোরের আলো ফোটার আগেই এক্স-কলিগ বীর বলের বিয়ে বাড়ি থেকে অটোরিকশায় রওনা হয়ে এসে নামলাম আড়িখলা রেলস্টেশনে। অফিস ধরতে হবে বলে বেশ তাড়াহুড়ো, অথচ সাতটা বাজলেও প্ল্যাটফর্ম যেন নির্বাক কোনো প্রাচীন চিত্র- স্থির, স্তব্ধ, প্রহেলিকার মতো নিস্তরঙ্গ।
লোকজনের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। স্টেশনের একদম কোণে শান্ত একটা টং দোকান, পাশে একমাত্র কাঠের বেঞ্চ।
কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম,
– লোকাল ট্রেন কি চলে গেছে?
বৃদ্ধ দোকানী অক্লান্ত স্বরে বলল,
– লোকাল তো বুধবারে চলে না, একটু পড়েই তিতাস কমিউটার আসবে।
তাহলে এক কাপ চা দিন আমার জন্য,
বলেই সামনে সাজানো বয়াম থেকে তিনটে ড্রাই কেক আর ঝুলন্ত কলার ছড়া থেকে দুটো চম্পা কলা ছিঁড়ে নিলাম। চা নাস্তা শেষ হতে না হতেই এক অপরিচিত ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বলল,
– এক কাপ চা আর একটা বেনসন দেন।
দোকানদার আমার দিকেই তাকিয়ে হেসে বলল,
৫টা বেনসন ছিলো, এই ভায়ে নিয়ে নিছে!
আমি পকেট থেকে একটা সিগারেটটা বের করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে ধরতেই সে খানিক লজ্জা পেয়েও কৃতজ্ঞ স্বরে বলল,
– থ্যাংকস, ভাই।
দ্বীপ্ত চাহনি মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। ফর্সা চেহারা, প্রাণচঞ্চল একরকম সতেজতা আছে, তবু দাড়িগুলো এলোমেলো যেন দিন দশেক অবহেলায় নিজেকে ইচ্ছে করেই ভাঙতে ছেড়ে রেখেছে। সিগারেট ধরিয়ে আকাশের দিকে প্রশান্তির ধোঁয়া ছেড়ে তাকাল আমার দিকে।
– ইয়ারপোর্ট নামবেন?
জ্বী না ভাই, তেজগাঁও। আপনি?
ছেলেটি হালকা থেমে কেবল বলল,
– বহু দূর।
একটা লৌহ-চিৎকারে বাতাস কেঁপে উঠল। চট্টগ্রামগামী ট্রেন সাই সাই করে ঢুকছে স্টেশনে। রেল কর্মী সবুজ পতাকা নাড়িয়ে সিগন্যাল দিলো। পাশে বসা যুবকটি হঠাৎ অস্থির হয়ে দ্রুত চা শেষ করার চেষ্টা করতেই দোকানদার বললো,
– ভাই, ব্যস্ত হইয়েন না। এই ট্রেন এখানে থামবে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে যেন নাট্যমঞ্চে অপ্রত্যাশিত প্রবেশ।
পিছন থেকে এক ভিক্ষুক হাত পেতে দাঁড়াল ওই তরুণের সামনে। কে জানত, এই ক্ষুদ্র দৃশ্যটাই হবে ভোরের নরম আলোয় বিস্ময়ের বিস্ফোরণ!
ছেলেটি শব্দহীন; মানিব্যাগ খুলে দোকানদারকে চায়ের টাকা দিয়ে বাকী সব টাকা ভিক্ষুকের হাতে তুলে দিলো।
এরপর –
সবকিছু যেন বজ্রগতিতে ঘটে গেল।
সে দৌড়ে ছুটে গেল ট্রেন লাইনের দিকে; তখনো আমার পাশেই পড়ে রইল তার কাঁধের ব্যাগটা।
আমি উঠে দাঁড়াতেই দেখি;
সে শুয়ে পড়েছে; চট্টগ্রামগামী ট্রেনের লাইনে।
আরে! না! কী করছে লোকটা!
বজ্রধ্বনির মতো ছুটে গেলো ট্রেন; তাকে উড়িয়ে নিয়েগেল শ- দুশ গজ দূর পর্যন্ত।
আমি আর এগোতে পারলাম না।
পাথরের ওপর ছিটকে পড়েছে তার হাতের অর্ধনিভো সিগারেটটা এখনো নিভে যায়নি, ধীরে ধীরে উড়ছে ধোঁয়া মুক্তির মতো। ঠিক তখনই একটা টোকাই কুড়িয়ে নিল নিভু নিভু অর্ধেক সিগারেট টা; সুখটান দিতে দিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি নিশ্চুপ বসেই রইলাম।
আবার শিস।
এবার আমার ট্রেন ঢুকে পড়ছে প্ল্যাটফর্মে।
ঘোর কেটে আমি উঠে দাঁড়ালাম
যেন সত্যিই –
কোথাও কিছু হইনি।
আসতে আসতে ওর হয়ে নিজেকে ভাবতেই –
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই লাইনগুলো ভেতরে ভেতরে কাঁপতে লাগল –
নিখিলেশ, আমি এইরকম ভাবে বেঁচে আছি –
তোর সঙ্গে জীবনবদল করে কোনো লাভ হলো না আমার…
