হাজারীবাগ থানা পুলিশ রাজধানীর রায়েরবাজার থেকে আলমগীর নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশ ছবিসহ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় প্রচারমাধ্যমে। পরদিন পত্রিকায় ছাপা হয় ছবি। যুবকটির বুকে আঁটা কাগজে লেখা, ‘সন্ত্রাসী ও মাদক চোরাচালানি’। আলমগীর কারাভোগ করে কয়েক মাস। পরে পুলিশের তদন্তেই বের হয়ে আসে আলমগীর নির্দোষ। তারা আসলে ভুল করে সুমন নামে অন্য এক আসামির পরিবর্তে তাকে ধরেছিল। এরপর আলমগীরের মা আক্ষেপ করে বলেন, “আমি ফুটপাতে সবজি বিক্রি করে খাই বলে কি আমার মান ইজ্জত নেই? পুলিশ আমার পোলারে ধইরা তার বুকে ‘সন্ত্রাসী মাদক চোরাচালানি’র সিল মাইরা দিল!” কয়েক বছর আগের ঘটনা এটি।
https://i0.wp.com/dailykalerkantho.com/admin/news_images/255/thumbnails/image_255_81059.jpg?w=1080
গোয়েন্দা পুলিশ লালবাগ এলাকা থেকে এক যুবককে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে। পরদিন ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী’ পরিচয়ে যুবকটির ছবি ছাপা হয়। পরে পুলিশই জানতে পারে, সোর্স (পুলিশকে গোপনে সংবাদদাতা) যুবকটির বাসায় অস্ত্র রেখে তাকে ফাঁসিয়েছে। যুবকটি এরপর ছাড়া পায়। গ্রেপ্তার হয় সোর্স। কিন্তু এরই মাঝে যুবকটির সামাজিক আর মানসিকভাবে যেটুকু ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। এটিও পুরনো ঘটনা। তবে একই কায়দায় এখনো পুলিশ গ্রেপ্তার হওয়া অনেক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হাজির করছে। গত ৮ আগস্ট ডিবি পুলিশ ছয় গার্মেন্টকর্মীকে গ্রেপ্তার করে প্রচারমাধ্যমগুলোতে প্রেস রিলিজ পাঠায় তাদের ছবিসহ। ছবিতে দেখা যায়, কাগজ এঁটে ছয় তরুণীর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে, যদিও বিষয়টি এখনো অভিযোগ পর্যায়েই রয়েছে।
বিচারে সাজা পাওয়ার আগেই কাউকে দোষী বানিয়ে বা গ্রেপ্তারের পর সাধারণ বন্দিদের বুকে কাগজ এঁটে দিয়ে তার নামের শেষে বিশেষণ জুড়ে দেওয়াকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করেন আইনবিদরা। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও মনে করেন, এটি ঠিক নয়, তারপরও পুলিশ কাজগুলো করে আসছে। আইনজীবীরা বলেন, ‘আগে আটক ব্যক্তির হাতে অস্ত্র ধরিয়ে, ছবি উঠিয়ে তা প্রচার করা হতো। কিছুটা সচেতনতা বাড়ার কারণে আর সে ধরনের ছবি পুলিশ প্রচার করছে না। তবে এখনো যা করছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।’
কয়েকজন আইনজীবী গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হয় সংবিধানের আওতায়। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না (‘No person shall be deprived of life or personal liberty save in accordance with law’ |’ ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ মানবাধিকার নেত্রী এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, আদালত থেকে সাজা পাওয়ার আগে বা আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে সরাসরি অভিযুক্ত করা ঠিক নয়। এটি সম্পূর্ণ আইন ও মানবতাবিরোধী একটি অপরাধ। আইন একজনকে সাজা দেওয়ার ব্যাপারেও এতটা সতর্ক যে, নিম্ন আদালতে সাজার রায় হলেও সেই ব্যক্তিতে উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার দিয়েছে।
এলিনা খান আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে দেখা যায় যে, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলেই তার নামের আগে-পরে নানা বিশেষণ লাগিয়ে বুকে নামফলক এঁটে তার ছবি প্রচারমাধ্যমে পাঠায় বা টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে হাজির করে। দেশের প্রচলিত কোনো আইনই পুলিশের এই কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। এই অপরাধ চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।’
আরেক বেসরকারি সংগঠন হেলপ ফর ইউ-এর চেয়ারম্যান জান্নাতুল মাওয়া জানান, ‘আমাদের দেশে পুলিশ ও র‌্যাব প্রায়ই এভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আসছে।’ তিনি বলেন, ‘তারা এরকম একটি ‘কেইস স্টাডি’ পেয়েছেন, যেখানে মোহাম্মদপুর এলাকার একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে প্রচারমাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্রসহ তার ছবি পাঠিয়ে ঢালাওভাবে সন্ত্রাসী সাজায়। পত্রিকাগুলোও সেভাবে সংবাদ দেয়। পরে পুলিশের তদন্তেই প্রমাণ মিলেছে, ঘটনাটি একটি সাজানো নাটক। পরে ওই যুবক ছাড়া পেলেও ঘটনার পর থেকেই সে মানসিকভাবে অসুস্থ। পত্রিকায় ‘সন্ত্রাসী’ ছেলের ছবি ছাপা হওয়ার পর বাবা লজ্জায় চাকরি ছেড়ে দেন। ছোট ভাই-বোনরাও বন্ধ করে দিয়েছিল স্কুলে যাওয়া। ওই পরিবারের সদস্যরা আজও ওই ঘটনার খেসারত দিয়ে চলছে বলে জানান জান্নাতুল মাওয়া।
পুলিশের এই প্রবণতার ব্যাপারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, সাক্ষ্য-আইনে পুলিশের এই প্রচারণার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। পুলিশের এই প্রবণতা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং আইনের পরিপন্থী। তাদের বর্ণনা, ছবির ধরন, বুকে নাম ফলক লিখে দেওয়া_এসব দেখে মনে হয়, বিচারের আগেই পুলিশ তাদের সন্ত্রাসী বা অপরাধী বানিয়ে দিয়েছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং খুব শিগগিরই এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত।
টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, আসলে নিজেদের প্রচারণার জন্যই মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এগুলো করে থাকেন। এতে করে তাঁরা এক ধরনের ফায়দাও লোটেন। পুলিশ নিয়ন্ত্রিত হয় যে আইন দ্বারা, সেই রেগুলেশন বা পুলিশ প্রবিধান অথবা ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই। আইনত পুলিশ কোনো বন্দির ছবি তুলতে পারে শুধু কঠোরভাবে সিলগালা করে সংরক্ষণের জন্য। কোনো বন্দি যদি জামিনে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যায় এবং পরে পলাতক অবস্থাতেই তার সাজা হয়, সে ক্ষেত্রে এই ছবির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। পত্রিকায় সরবরাহ করার জন্য ছবি পাঠানোর কোনো আইনত বৈধতা পুলিশের নেই।
কর্মকর্তারা আরো জানান, তাঁরা এই গায়ে নানা বিশেষণের বা উপাধির লেভেল লাগানো ছবি প্রচারমাধ্যমগুলোতে পাঠানোর পক্ষে নন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই ছবি ছাপা হলে ধরা না পড়া অপরাধীরাও মানসিকভাবে সতর্ক হয়ে যাবে এবং লোকলজ্জার ভয়ে হয়তো আর অপরাধ করবে না। এই ছবি বিচারকাজে ব্যবহৃত হয় বলেও মাঠপর্যায়ের ওই কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়ে থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই পুলিশ কর্মকর্তারা আরো বলেন, বিষয়টির পেছনে এক ধরনের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও কাজ করে হয়তো। কারণ ধরা পড়ার পর অনেকেই যেকোনো মূল্যে হোক নিজের মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
বিশিষ্ট আইনজীবী আনিসুল হক বললেন কিছুটা ভিন্ন কথা। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বললেন, এই ছবি সরবরাহ করা বা প্রচার করা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে তাঁর কাছে মনে হয় না। বরং যারা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত এ ধরনের ছবি তাদের জন্যও একটা সতর্কবার্তা। বিচার চলাকালে সাক্ষ্য আইনেও অনেক সময় এ ধরনের ছবির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তবে এটিও সত্য, এই পদ্ধতিকে সমপূর্ণ আইনানুগও বলা যায় না। পুলিশকে এই ছবি সরবরাহের ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে এখন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. ওয়ালিদ হোসেন। গতকাল তিনি এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, আপরাধের ঘটনা ও অপরাধীর তথ্য প্রচারের জন্য পুলিশ আসামিদের অভিযুক্ত ও শনাক্ত করে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে প্রসিকিউশনের (যথাযথ বিচার) স্বার্থে তাঁরা আসামিকে অপরাধী বলে থাকেন। তদন্তে আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হবে কি হবে না, তা তখন বিবেচনায় থাকে না। তিনি আরো বলেন, নির্দোষ প্রমাণিত হলে কেউ কখনো এ ব্যাপারে মানহানির অভিযোগ তুলেছেন বলে তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে আইনের অন্য কোনো ব্যাখ্যাও তিনি জানেন না।