
শিবনাথ সাহার মঠ
বাংলার ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্মান, যাঁরা কেবল পরিবার বা জনপদের নয়—একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন। তেমনই এক অনন্য নাম স্বর্গীয় শিবনাথ সাহা—একজন শিক্ষানুরাগী, দানবীর, সমাজসেবক এবং সময়ের অনেকটা এগিয়ে থাকা চিন্তাবিদ। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী ও বাজিতপুর অঞ্চলে তিনি এক বিস্ময়কর আলোকবর্তিকা, যাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও সমাজের বুকে জ্বলজ্বল করছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
১২৫৫ বঙ্গাব্দের ১৭ আষাঢ় (১ জুলাই ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ) এক সনাতন ধর্মাবলম্বী সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শিবনাথ সাহা, কটিয়াদী উপজেলার জোয়ারিয়া কুড়িখাই গ্রামে। পিতা কার্তিক চন্দ্র সাহা এবং পিতামহ যাত্রাবর সাহার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব সমৃদ্ধ না হলেও তাঁরা ছিলেন নীতিবান ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। শিবনাথ সাহা ছিলেন দুই ভাইয়ের একজন—অগ্রজ ছিলেন শম্ভুনাথ সাহা।
অর্থনৈতিক উত্থান ও ব্যক্তিগত জীবন
শিবনাথ সাহা তাঁর কর্মদক্ষতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে পারিবারিক অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করেন এবং হয়ে ওঠেন একজন তালুকদার। তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বাজিতপুরের আলিয়াবাদের কালীসন্দুরী সাহার সঙ্গে। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় তিন কন্যা—বিদ্যাসুন্দরী, জগৎতারা ও জয়াদূর্গা সাহা। যদিও তাঁদের জীবনে পুত্রসন্তানের অভাব ছিল, শিবনাথ সাহা তাঁর ভাই শম্ভুনাথ সাহার ৪র্থ পুত্র সুরেন্দ্রনাথ সাহাকে দত্তক গ্রহণ করেন এবং উত্তরাধিকার রূপে গ্রহণ করেন।
বর্তমানে তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে রয়েছেন কটিয়াদী বাজারের খ্যাতনামা ব্যবসায়ী বাবু দিলীপ কুমার সাহা, রতন কুমার সাহা, উত্তম সাহা, বিশ্বনাথ সাহা, কৃষ্ণ পদ সাহা প্রমুখ।
শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে অবিস্মরণীয় অবদান
শিবনাথ সাহা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, “শিক্ষাই জাতির মুক্তি।” তাই জীবনের বড় একটি অংশ তিনি উৎসর্গ করেন শিক্ষার প্রসারে। তাঁর একাধিক উদ্যোগ আজও হাজারো মানুষকে আলোকিত করছে—
-
স্ত্রীর নামে বাজিতপুরে ‘কালিতারা পাঠশালা’
-
বনগ্রামে পিতার নামে ‘কার্তিক চন্দ্র সাহা লাইব্রেরি’
-
ধুলদিয়ায় ‘শিবনগর’ গড়ে তোলেন
-
কামালপুরে নির্মাণ করেন পূজামণ্ডপ
-
এবং ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সরারচর শিবনাথ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’
এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। কটিয়াদীতে নিজ নামে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে সমাজপতিরা তীব্র বিরোধিতা করেন। পরে গোবিন্দপুর জুনিয়র হাই স্কুল (প্রতিষ্ঠিত ১৯০৮) কে উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপ দিতে শ্রী রাম নারায়ণ সাহা শিবনাথ সাহাকে অনুরোধ করলে তিনি সদয় সম্মত হন। এই বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে এখনও দৃশ্যমান রয়েছে ডাঃ তারক বাবুর দাদা ও তার পত্নীর স্মৃতি বহনকারী জোড়া মঠ।
দানশীলতা ও ট্রাস্ট গঠন
শুধু শিক্ষা নয়—ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি ১৯২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর একটি বিশেষ ট্রাস্ট গঠন করেন যাতে তাঁর উদ্যোগসমূহ ভবিষ্যতেও স্থায়ী রূপ পায়। তাঁর দানশীল মনোভাব, উদারতা এবং উন্নয়নচিন্তা এই ট্রাস্টের মধ্য দিয়েই আজও জীবিত।
শেষ যাত্রা ও উত্তরাধিকার
এই সমাজগবেষক, শিক্ষানুরাগী, দানবীর মানুষটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৭ আষাঢ় (১ জুলাই ১৯২৪) তাঁর নিজ বাসভবনে ৭২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর প্রায় এক শতাব্দী পার হলেও, তাঁর স্মৃতি এখনো অম্লান। তাঁর গড়া ‘শিবনাথ সাহা বাজার’ আজও কটিয়াদীর অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। তাঁর বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, সেই কারুকার্যময় দালান আজ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
উপসংহার
স্বর্গীয় শিবনাথ সাহা কেবল একজন তালুকদার বা দানবীর ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ, যিনি শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিকতার একটি দুর্লভ সমন্বয়। তিনি দেখিয়ে গেছেন—একজন মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন আর নিষ্ঠা কিভাবে একটি জনপদ, একটি সমাজ এমনকি একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে।
আজ তাঁর ১৭৫তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এক অকৃত্রিম পথপ্রদর্শককে—
যাঁর কীর্তি, দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ চিরকাল বাঙালির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে

